“শূন্য”

প্রকাশিত: ১:০৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২, ২০২১

“শূন্য”

এডভোকেট মো: আমান উদ্দিন: 
শূন্যের যেমন আভিধানিক কোন অর্থ নেই। নিজস্ব স্বত্তা নেই। তার ডানে যত শূন্যই যোগ-বিয়োগ, ভাগ-গুণ করেন না কেন তার কোন অর্থ নেই। কেননা সে শূন্য। যখনই তার বামে ১, ২, ৩ ইত্যাদি সংখ্যা যুক্ত বা শূন্যের ডান দিকে যত সংখ্যাই যুক্ত হবে, তখন তার বিশাল অর্থ দাড়াবে। তখন সে লক্ষ, কোটি, মিলিয়ন, বিলিয়ন ইত্যাদি রূপ লাভ করে চমক দেখাতে সক্ষম। সুতরাং একজন আরেকজনের সহযোগীতা ছাড়া জগৎটাই অসম্পূর্ণ বা শূন্য।

 

 

 

যেমন একটি বাড়ী বা স্থাবর সম্পদ করলেন ২/৩ শত কোটি টাকা ব্যয় করে। হউক সৎ বা অসৎভাবে উপার্জন। করে গেলেন কিন্তু ভোগ করলেন না। পূর্ব পুরুষ হয়তো গরিব, ঋণগ্রস্থ, চারিত্রিক গুণাবলী, সমাজের পরিত্যাক্ত শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত। এককথায় পূর্ব পুরুষ সমাজের কাছে উচ্চিষ্ঠ পর্যায়ের ছিল। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়ত হাজারও কোটি টাকা, মান সম্মান, যশ, খ্যাতি সবই অর্জন করল। সে কি একবার ভেবে দেখেছে? তার পূর্ব পুরুষরা সমাজের উচ্ছিষ্ট পর্যায়ের ছিল।

 

 

 

তাদের জন্য প্রকাশ্য অথবা অপ্রকাশ্যভাবে, তাদের জন্য স্মৃতিচারণ, স্মরণসভা, ত্রæটি-বিচ্যুতির জন্য সমাজের কাছে ক্ষমা চাইতেই পারত। কিন্তু তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হয়ে, নিজেকে পরিচিত করে গড়ে তুলতে চায়।

 

সে- নাকি ঐতিহ্যবাহি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে। তখন সমালোচনার ঝড় উঠে। সাধারণ জনগণ একে অপর কে প্রশ্ন করতে থাকে, তার বাপ- দাদারা পরিত্যাক্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বরং নব্য কোটিপতিকে সমালোচকরা বলতে শুনা যায়, তার পূর্ব পুরুষরা পরিত্যক্ত ছিল। যদি সে সমাজের অন্য দশজনের মত নরম স্বভাবের চলাফেরা করতো, হয়তো তাকে তার পূর্ব পুরুষদের বিভিন্ন হীন কর্মকান্ডের জন্য জনসম্মুখে প্রকাশ করতো না।

 

 

 

স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ভালো বংশের লোকজন যতই গরীব বা অভাবী হয়ে যাক না কেন, সে কখনো তার পূর্ব পুরুষদের রেখে যাওয়া সম্মান, যশ, খ্যাতি এগুলো ভুলেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে না। বরং অতীত স্মৃতিচারণ করে তাদেরকে সম্মানিত করার চেষ্টা করবে নিজ আচরনের দ্বারা। মানুষ মরনশীল। ১৮ হাজার মখলুকাতের মধ্যে আল্লাহর সৃষ্টি সকলেই একটি নির্দিষ্ট বয়স শেষ হলেই ভুমন্ডল ত্যাগ করে চিরকালের জন্য দেহটা মাঠির নীচে পুতে রাখেন তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মরা। অনেকের ভাগ্যে তাও জুটে না। গুম, অপহরণ হলে তো আর বলা যায় না।

 

 

আইনের ভাষায় জীবনের সংজ্ঞা নির্ধারিত। আইনের মাধ্যমেই কাউকে যাবজ্জীবন বা সশ্রম কারাদন্ড করে থাকেন মাননীয় আদালত। তখন সংগত কারনে প্রশ্ন এসে যায়, তাহলে যাবজ্জীবন কি ? অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে যাবজ্জীবন বলতে ৩০/৩২ বছরকেই বুঝিয়েছেন। আর এ সংজ্ঞা কার্যকর হয়ে থাকে দন্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পর। পূর্বের শূন্য কথাটিতে চলে আসি।

 

 

 

যেমনঃ একটি সুন্দর অট্টালিকা তৈরী করলেন। হালাল অথবা হারাম উপার্জিত সম্পদ দিয়ে। সমাজে সম্মানও কিছু অর্জন করলেন। পূর্ব পুরুষদের দন্যদশা বা তাদের অপকর্ম কোথাও আলোচনা শুনলে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। একবার কি ভেবে দেখেছেন শ্বাস প্রশ্বাস কত সময় আপনাকে দেওয়া হয়েছে। নিশ্চই জানেন না। একটি নির্দিষ্ট সময় পর সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় চিরদিনের জন্য পরপারে চলে যেতে হবে। শ্বাস চলে যাওয়ার পর এত সুন্দর বিলাস বহুল বাড়ীতে নিকটজনরাই বলবে, তাড়াতাড়ি দাফন কাফনের ব্যবস্থা করুন।

 

 

 

এক, দুই দিন…. পর মৃত দেহটি পাহারা দেওয়ার লোক পাবেন না। মাইকিং শুনে প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী বন্ধু বান্ধবরা জানাজায় শরিক হবে। স্মৃতিচারন করবে এবং বলতে শুনা যাবে ‘‘কুল্লু নাফসিন যা – ইকাতুল মউত’’ অর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে। এ কথাটি কয়জনই বা বিশ্বাস করে থাকে।

 

 

 

ধরে, নিলাম বেঁচে গেলেন ১০০ বছর। শেষের জীবনটা কষ্টদায়ক। যদি দ্বীনদার ঈমানদার কাউকে দুনিয়ার জমিনে রেখে যান, তাহলে হয়তো মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত যথাযথ সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন। যখনই দুনিয়ার সফর শেষ, কদাচিৎ ২০০ বছর পর আল্লাহ চাইলে সৃষ্টি জগতের রেখে যাওয়া অট্টালিকা দেখার সুযোগ করে দিলেন, অলৌকিক ভাবে। নিজের উপার্জিত চুরি চামারির মাধ্যমে ঘরটি তৈরী করে ছিলেন। সেই ঘরে নবাগতরা বসবাসে করিতেছে। তাদেরকে বললেন, এ ঘরটি নির্মান করতে কত কষ্ঠ করতে হয়েছে আমাকে। কত অন্যায় ভাবে অর্থ উপার্জন করেছি। আর আজ তোমরা আমাকে কেহ চিনতে পারতেছ না। না, চিনারই কথা। কারন পুর্ব পুরুষদের যতাযথভাবে চিনিনি। যদি চিনতাম এবং তাদেরকে আদর্শ মানুষ হিসেবে আল্লাহর জমিনে রেখে যেতাম, তাহলে অবশ্যই চিনতো। এসবের কিছুই করিনি।

 

 

 

 

ভোগ- বিলাস, চুরি-চামারিতে জীবন অতিবাহিত করে গেছি। নিজেও প্রকৃত মানুষ হইনি, ছেলে-মেয়েদেরকেও প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলিনি। সুতরাং তাহারা আমাকে না চিনার জন্য আমি নিজেই দায়ী। আর এ দায়ির জন্য অনন্তকাল কবরের আজাব সহ্য করতে হবে। যদি ভাল কাজ ও সৎ সন্তান রেখে যেতেন, তাহলে হাদিয়া হিসাবে কবরের পাশে গিয়ে কায়মনো বাক্যে অঝোরে কান্নাকাটি করলে কিছুটা হলেও কম আজাব হতে পারত আল্লাহ চাইলে। বাড়ীটি নির্মান করতে কোটি কোটি বৈধ-অবৈধ উপার্জিত টাকা দিয়ে বাড়ী-গাড়ী সবই করে গেলেন।

 

 

যাদের জন্য করে গেলেন, তারা আজ কেহ চিনে না, চিনবেও না। অলৌকিক ভাবে ফিরে আসলেন সে ঘরে, কিন্তু থাকার জায়গা পাবে না। তখন আফসোস করে বলবেন, যা কিছু করে গেলাম, তার ফলাফল ‘‘শুন্য ’’। ওলি কুল শিরমনি দরগাহ মসজিদের খতিব আল্লামা মৌলানা আকবর আলী (রহ:) বলতেন, যখন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি হুজুরের সাথে একটু দেখা করতে চাইতেন। হুজুর তখন বলতেন, কে সেই প্রভাবশালী ? প্রেসিডেন্ট হুসেন মোঃ এরশাদ, অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ প্রমুখ লোকজন দর্শনার্থী। হুজুরের সোজা উত্তর ছিল, তেউ কিতা অইল।

লেখকঃ সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও কলামিষ্ট, বিয়ানীবাজার, সিলেট।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com