
প্রজন্ম ডেস্ক:
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। ৫ আগস্ট পালিয়ে দেশ ছাড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অবসান ঘটে ১৫ বছরের টানা শাসনের। ৮ আগস্ট রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ক্ষমতার এই পালাবদলের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়েছে সেবা সংস্থাগুলোর অফিস শৃঙ্খলা। বিধিমালা জারি করেও ফেরানো যাচ্ছে না স্বাভাবিক পরিস্থিতি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গণপূর্ত অধিদপ্তর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা ওয়াসা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে একধরনের স্বেচ্ছাচারিতা। সময়মতো অফিসে আসছেন না প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কর্মস্থলও ত্যাগ করছেন ইচ্ছামতো। আবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে কেউ কেউ যাচ্ছেন সাইট পরিদর্শনে। নানা অজুহাতে অফিস ফাঁকি দিচ্ছেন অনেকে। অফিস শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ায় কমছে কাজের গতি। নিয়মিত উপস্থিতির বিধিমালা মানতে জারি করা হচ্ছে অফিস আদেশ।
জানা গেছে, পতিত সরকারের আমলে এসব সংস্থায় কর্মরত সুবিধাভোগী ও বিতর্কিতদের মধ্যে হামলা-মামলার ভয় কাজ করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ৮ মাসেও একধরনের চাপা আতঙ্কে ভুগছেন তারা। আর এর প্রভাব পড়ছে কর্মক্ষেত্রে। কর্তকর্তা-কর্মচারী স্বেচ্ছাচারিতায় বেকায়দায় পড়েছে সংস্থাগুলো। এগিয়ে নিতে পারছে না বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ।
সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ অনুযায়ী প্রত্যেককে সকাল ৯টায় অফিসে উপস্থিত এবং বিকাল ৫টায় কর্মস্থল ত্যাগ করতে হবে। এই বিধানে পরিপালনে ভাটা পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত ও কর্মস্থল ত্যাগ করতে অফিস আদেশ জারি করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। তাদের বায়োমেট্রিক ডিজিটাল হাজিরা নিশ্চিত করার জন্যও বলা হচ্ছে। অবশ্য রাজউকে এখনও বায়োমেট্রিক হাজিরা চালু হয়নি বলে জানা গেছে।
ডিএসসিসি :
৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি)। একসময়ের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী আওয়ামীপন্থি কর্তকর্তা-কর্মচারীদের ওপর ক্ষিপ্ত হন সুবিধাবঞ্চিতরা। সংস্থার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আশিকুর রহমান ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকেরের অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। এ ঘটনার পর পুরো নগর ভবনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর থেকে আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে অফিসে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে আশিকুর রহমানকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর থেকে অফিস কার্যক্রমে বিঘ্ন আর প্রশাসনিক কাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় গেল ২০ ফেব্রুয়ারি সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যথাসময়ে অফিসে আসতে ও ছুটির আগে কর্মস্থল ত্যাগ না করতে দপ্তর আদেশ দেয় ডিএসসিসি।
আদেশে বলা হয়, সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কিছু কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী যথাসময়ে অফিসে আগমন করছেন না ও অফিস ছুটির পূর্বে কর্মস্থল ত্যাগ করছেন। এতে অফিস কার্যক্রমে বিঘ্নসহ প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। এমতাবস্থায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে যথাসময়ে অফিসে আগমন এবং অফিস ছুটির নির্ধারিত সময়ের পূর্বে কর্মস্থল ত্যাগ না করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হলো।
নৈমিত্তিক ছুটি এবং অফিস ছুটির পূর্বে কর্মস্থল ত্যাগ করার প্রয়োজন হলে নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তার লিখিত অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়।
বিআরটিএ :
সম্প্রতি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বায়োমেট্রিক ডিজিটাল হাজিরা নিশ্চিত করতে বলা হয়। বিআরটিএ’র উপ-পরিচালক (প্রশাসন) মুহাম্মদ মাসুম বিল্লাহর সই করা অফিস আদেশে বলা হয়, বিআরটিএ সদর কার্যালয়ে নির্ধারিত সময়ে আগমন ও প্রস্থান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টার মধ্যে সদর কার্যালয়ে স্থাপিত বায়োমেট্রিক ডিজিটাল হাজিরা নিশ্চিত করার জন্য সদর কার্যালয়ে কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
ঢাকা ওয়াসা :
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সংস্থার নির্ধারিত পোশাক পরা বাদ দেন ঢাকা ওয়াসায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অনেকে নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে উপস্থিত হন না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা ওয়াসার একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী টাইমমতো অফিসে আসেন না। যারা অফিসে টেবিলওয়ার্ক করেন তাদের কেউ কেউ দেরি করে আসেন। যেসব কর্মচারী ওভারটাইম কাজ করেন তাদেরটা হয়তো মনিটরিং করা সহজ। আর অফিসাররা ওভারটাইম করেন না, তাদের হাজিরা হলেই চলে।’
ড্রেস কোড অনুযায়ী নির্ধারিত পোশাক পরতে অফিস সার্কুলার দেয় সংস্থাটি। ঢাকা ওয়াসার সচিব মো. মশিউর রহমান খানের সই করা সার্কুলারে বলা হয়, ঢাকা ওয়াসায় কর্মরত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, ঢাকা ওয়াসার ভবন, বিভাগ, জোন, প্রকল্প অফিস, প্লান্টসহ সব অফিসে অফিসকালীন ড্রেস কোড অনুযায়ী পোশাক পরিধান করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।
গণপূর্ত অধিদপ্তর :
ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১৫ জন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। এরপর থেকেই অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী কেবল হাজিরার মধ্যে তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছেন। তারা সময়মতো অফিসে উপস্থিত হন না। এমন পরিস্থিতিতে গত ৯ ফেব্রুয়ারি গণপূর্ত অধিদপ্তরে কর্মরত সব কর্মকর্তার উদ্দেশে বিধিমালা অনুযায়ী যথাসময়ে অফিসে উপস্থিত ও ত্যাগ করার জন্য আদেশ জারি করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। সংস্থাটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মো. মাহাবুব হাসান এই অফিস আদেশে সই করেন।
আদেশে বলা হয়েছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে কর্মরত সবার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা-২০১৯ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে উপস্থিতি ও ত্যাগের নির্দেশনা রয়েছে। তা সত্ত্বেও কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী যথাসময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত হন না এবং নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই অফিস ত্যাগ করেন। ফলে সরকারি কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, যা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এমতাবস্থায়, নিম্নবর্ণিত নির্দেশনাসমূহ প্রতিপালনের জন্য আদিষ্ট হয়ে নির্দেশ প্রদান করা হলোÑ গণপূর্ত অধিদপ্তরে কর্মরত সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সকাল ৯টার মধ্যে আবশ্যিকভাবে নিজ নিজ কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো। একই সঙ্গে বিকাল ৫টার পূর্বেই অফিস ত্যাগ না করার জন্য নির্দেশ প্রদান করা হলো। কোনো কর্মকর্তা সভায় যোগদান বা সাইট পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে নিজ কর্মস্থল ত্যাগের পূর্বে অবশ্যই তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে অবহিত করবেন। অফিসে বিলম্বে উপস্থিতি বা বিনানুমতিতে অফিস চলাকালীন কর্মস্থল ত্যাগ ও অননুমোদিত অনুপস্থিতির বিষয়ে সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অফিসে আদেশ জারির পরও যারা নিয়ম মানছেন না তাদেরকে ডেকে নিয়ে মৌখিকভাবে সতর্ক করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ১ মার্চ থেকে সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী সংস্থাটি ব্যবস্থা নেবে বলেও জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তের গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ‘এখানে বেশিরভাগ কর্মকর্তা ও কর্মচারী ঠিকমতো অফিস করেছেন না। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, বিভিন্ন নেতা ও এমপি-মন্ত্রীদের আত্মীয়স্বজন পরিচয় দিয়ে ক্ষমতার প্রভাব দেখাতেন, অফিসে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করতেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী অফিসে অনিয়মিত। কেউ কেউ তদবির করে দ্রুত ঢাকার বাইরে বদলিও নিয়েছেন।’
তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীর উদ্দেশ করে দেওয়া অফিস আদেশকে রুটিনওয়ার্ক বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) মো. মাহাবুব হাসান বলেন, ‘সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে রাষ্ট্র গঠন হচ্ছে। সরকার গঠন হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সব কাজ যেন যথাযথভাবে হয়, সেজন্য এই অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। এটা আমাদের রুটিনওয়ার্ক।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিস করছেন না বিষয়টি এমন নয়। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীসহ কিছু লোক আছে, যারা অফিস টাইম শেষ হওয়ার আগেই চলে যান। তারা যেন অফিস টাইমের আগে না যান সেজন্য এই আদেশ জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া এটা আমাদের নিয়মিত কাজ।’
হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্কে আছেন এবং ঠিকমতো অফিস করেছেন না, এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে বিষয়টি সঠিক নয়। কেউ যদি এমনটা বলে থাকেন তাহলে তিনি ভুল বলছেন।’
সেবা সংস্থাগুলোর অফিস শৃঙ্খলা ব্যাহত হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘সরকার পতনের পর যাদের মধ্যে ভয় আছে, তারা তো আসবে না। ৫ আগস্টের পর আমি নিজে রাজউকে গিয়ে দেখেছি পুরো অফিস খালি, কেউ নেই। সরকার পতনের পর সেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পালিয়েছেন কিংবা নিয়মিত অফিসে উপস্থিত হন না। ১৫ দিনের মধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। তাদেরকে কেন নোটিস দিয়ে ডাকতে হবে? হাজিরায় যারা অনুপস্থিত তাদের বেতন বন্ধ করে দেওয়া উচিত।’
Sharing is caring!