
প্রজন্ম ডেস্ক:
চলতি বছরের ডিসেম্বরকে সামনে রেখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে সে অনুযায়ী দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই ইসির। নির্বাচন আয়োজনে ভোটের সামগ্রীর জন্য জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপির) অনুদানের দিকে তাকিয়ে আছে কমিশন। যদি সময়মতো ইউএনডিপি ভোটের সামগ্রী সরবরাহ করতে না পারে তা হলে বিপাকে পড়তে পারে ইসি।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে প্রস্তুতির কয়েকটি অনুষঙ্গের মধ্যে নির্বাচনের সামগ্রী কেনার উদ্যোগ একটি। বাকি কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে সর্বশেষ আদমশুমারির প্রতিবেদন অনুযায়ী ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা বিন্যাস, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কার্যক্রম ও নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন।
অথচ হালনাগাদ কাজ চলমান থাকলেও এখনও শুরু হয়নি মালামাল ক্রয়-প্রক্রিয়া। বিনামূল্যে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) অনুদানে এগুলো পাওয়ার অপেক্ষায় নিজ উদ্যোগে কেনায় সময়ক্ষেপণ করছে কমিশন। যদি ব্যাটে-বলে না মেলে সেদিন থেকেই সরকারি অর্থায়নের তড়িঘড়ি ক্রয় প্রক্রিয়ায় নেমে পড়তে হবে সাংবিধানিক সংস্থাটিকে। তখন একধরনের চাপে পড়ে যেতে পারে কমিশন, এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন ইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ইউএনডিপি কিছু কিছু জিনিস আমাদের দেবে যেমন- ল্যাপটপ ও অমোচনীয় কালি ইত্যাদি। বিদেশ থেকেও তারা (ইউনডিপি) কিছু কিছু প্রকিউরমেন্ট করবে। আমাদের কনসার্ন ডিভিশন সারাক্ষণ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। নির্বাচনি কেনাকাটার খরচ কীভাবে কমানো যায়, আমাদের মধ্যে সেরকম একটা মানসিকতা আছে। কোনটা আমাদের আছে বা কোনটা নেই কিংবা কোনটা ইউএনডিপির কাছে পাব অথবা কোনটা আমরা কিনবÑএগুলো নিয়ে একটা ডিটেইলস দেওয়া হয়েছে। ইউএনডিপি আমাদের কিছু দেবে আমরাও কিছু কিনব। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে বাজেট চাওয়া হয়েছে। তারা যদি সময়মতো দিতে না পারে বা ফেল করে এ জন্য আমাদের অল্টারনেটিভ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী এগুতে হবে। চ‚ড়ান্ত প্রস্তাবটি আমরা পাইনি। অন্যদিকে ডিসেম্বরেই নির্বাচনের মালামাল কেনার জন্য চেকলিস্ট আমরা তৈরি করেছিলাম। কিন্তু এখনও ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। কারণ ইউএনডিপি অনুদান সরবরাহ করতে ইচ্ছুক। যদি শেষ পর্যন্ত না পাওয়া যায়, তা হলে নিজ উদ্যোগে কেনা শুরু করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি সংসদের সাধারণ নির্বাচন করতে কমিশনের ৭০ ধরনের মালামাল লাগে। এগুলো সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে কেনার প্রক্রিয়া শেষ করতে ছয়-সাত মাস সময় লাগে। আগামী ৬ ডিসেম্বর গণতন্ত্র দিবসে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন করতে চাইলে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করতে হবে। আর অক্টোবরের মধ্যভাগের পর তফসিল ঘোষণা করতে হবে। এর মধ্যে প্রার্থীদের মনোনয়ন ফরম, লাল গালা, স্ট্যামপ্যাড, অমোচনীয় কালির কলম, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও বাক্সের লক, গানি ব্যাগ, হেসিয়ার ব্যাগ, হেসিয়ান ছোট ব্যাগ, অফিসিয়াল সিল ও ব্রাশ সিল।
ইসির কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনের মালামাল কেনার জন্য ১০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয় না। এখাতে গত নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল ৮০ কোটির মতো। ওই নির্বাচনের অনেক কিছু ব্যবহারের উপযোগী থাকায় ব্যয় এবার আরও কম হবে। এই সীমিত টাকার জন্য বিদেশি সংস্থার সহায়তার জন্য অপেক্ষা না করার পক্ষে ইসির কর্মকর্তারা।
তারা বলেন, আমরা দেখছি- প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না নিয়ে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু করায় পদে পদে হোঁচট খেতে হচ্ছে। ইউএনডিপি থেকে ল্যাপটপসহ যে যন্ত্রাংশ সরবরাহ করা হয়েছে তা দিয়ে ভোটার নিবন্ধন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। কারণ বেশিরভাগই ফাংশন করছে না। এ কারণে ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা চরম ভোগান্তি নিয়ে কাজ করছেন। সারা দেশের পাশাপাশি ঢাকা জেলায় ভোটার তালিকা হালনাগাদের নিবন্ধন কার্যক্রম চলছে জোড়াতালি দিয়ে। তথ্য সংগ্রহকারীদের ছবি তুলে নিবন্ধনের কাজ যে যন্ত্রাংশ দিয়ে করানো হচ্ছে (পুরোনো-নতুন) সবগুলোই নিম্নমানের। এসব ল্যাপটপসহ ভোটার কাজের জন্য যা যা প্রয়োজন বেশিরভাগ অনুদানের মাধ্যমে পেয়েছে ইসি। কিন্তু সেগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহায়ক না হওয়ায় ভোটের কাজে যুক্ত ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
ইউএনডিপির অনুদানের যন্ত্রাংশ ত্রুটিপূর্ণ হালনাগাদ কাজে ইউএনডিপি থেকে যে যন্ত্রাংশ দিয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগ ত্রুটিপূর্ণ। এ কারণে দেশজুড়ে হালনাগাদের মাধ্যমে যে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে সেটি নির্ভুল হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।
নথির তথ্যমতে, সফটওয়্যার নতুন ও ডিভাইস পুরোনো হওয়ায় মিস ম্যাচ হচ্ছে, নতুন ক্যামেরা হলেও সকালে চার্জ দিলেও ব্যাক-আপ দুপুরের আগে শেষ হওয়া, পুরোনো ল্যাপটপের পোর্টগুলো সঠিকভাবে না পাওয়া, বারবার ডিভাইস ছেড়ে দেওয়া, প্রিন্টার পুরোনো হওয়ায় প্রুফ কফি প্রিন্ট করতে সমস্যা সৃষ্টি হওয়া, ভোটারের বায়োমেট্রিক গ্রহণের সময় ল্যাপটপ হ্যাং, স্লো ও ২ থেকে ৩টি ফরম পূরণের পর বায়োএন্ড্রোল হতে অটো লগ আউট হয়ে যাওয়া, প্রতিটি ল্যাপটপ কয়েকজন ভোটারের রেজিস্ট্রেশন করার পরই বিভিআরএস সফটওয়্যার বন্ধ বা হ্যাং হওয়া, পুরোনো ল্যাপটপ হওয়ায় ফিঙার, আইরিশ স্ক্যানার, সিগনেচার প্যাড ও ক্যামেরায় সমস্যা করে এবং বারবার বিভিআরএস কেটে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ চলে গেলে ল্যাপটপ রিস্ট্রার্ট হতে সময় লাগা, ভোটার নিবন্ধন করার সময় বায়ো-এনরোল সফটওয়্যার হঠাৎ করে নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যাওয়া, নতুন ক্যামেরাগুলো পুরোনো ল্যাপটপে ঠিকভাবে কাজ না করা এবং ঢাকা থেকে লাইসেন্স করে আনা ল্যাপটপের কাজের মাঝে লাইসেন্স নট ফাউন্ড হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
আবেদন চেয়ে দল নিবন্ধনের বিজ্ঞপ্তি জারি হয়নি যেকোনো সংসদ নির্বাচনের আগে নতুন দলের নিবন্ধনের জন্য কমিশন থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। কিন্তু এখনও সেটি জারি করেনি কমিশন। নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করে একটি দলকে নিবন্ধন দিতে গেলে কমিশনের কয়েকমাস সময় লাগে। এখনও সে উদ্যোগও শুরু হয়নি ইসিতে। কথা বলে জানা যায়, নিবন্ধনের জন্য আদৌ বিজ্ঞপ্তি জারির প্রয়োজন আছে কি না তা খতিয়ে দেখছে ইসি। বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নতুন দল আবেদন করতে পারে না। ইতিমধ্যে ছাত্র-জনতার ব্যানারে নতুন দল গঠন করা হয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আমরা জোরেশোরে প্রস্তুতি নিচ্ছি। ভোটার তালিকার পাশাপাশি অন্যান্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। সংসদীয় আসনের সীমানা পরিবর্তনে অনেক আবেদন এসেছে। আমরা এরইমধ্যে সরকারকে আইনটি সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছি। এখন সংস্কার কমিশন না হলেও তো আমাদের মিনিমাম হলেও সংস্কার করতে হবে। সেটা রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন হোক, আর সীমানা নির্ধারণ হোক, সেটা আমরা চেষ্টা করছি। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, এখন আমাদের ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হবে জুন মাসের শেষে। এখন সুষ্ঠু ভোটার করার জন্য বাড়ি বাড়ি যাচ্ছি। এখন ডাটা এন্ট্রির কাজ চলছে। আমরা যথাসম্ভব ব্যবস্থা রাখছি। যাতে ভুলটা মিনিমাম হয়।
Sharing is caring!