সাজানো হচ্ছে নির্বাচনী প্রশাসন

প্রকাশিত: ৪:৪৬ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৪, ২০২৩

সাজানো হচ্ছে নির্বাচনী প্রশাসন

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের দিয়ে কয়েক স্তরে জনপ্রশাসন সাজানো হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা আগেভাগেই নির্বাচনমুখী প্রশাসন সাজানোর তৎপরতা শুরু করেছেন। গত বছর থেকেই দৃশ্যমান হয়েছে সেই কার্যক্রম।

ক্ষমতাসীনদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রশাসনের শীর্ষ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়েও সরকারের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে শতভাগ আস্থাশীল, চৌকস ও সাহসী এবং একই সঙ্গে প্রগতিশীল হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হবে। যাদের ভূমিকা ও আদর্শ নিয়ে সংশয় রয়েছে; তাদের সরিয়ে দেওয়া হবে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে। এরই মধ্যে অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, পাঠানো হতে পারে আরও কয়েকজনকে। বিএনপি আমলে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে বিশেষ নজরদারিতে। দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তার সমন্বয়ে চলছে এসব কার্যক্রম। মাঠ প্রশাসন সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে; অবসরপ্রাপ্ত এমন কয়েকজন সরকারঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছেন।

 

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে সরকার। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা দলীয় ফোরামে একাধিকবার এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে দলীয় প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে বিচক্ষণতাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় অনেক আগেই নির্বাচনমুখী প্রশাসন সাজানোর কাজ শুরু হয়েছে। আগামী নির্বাচন ঘিরে প্রশাসনের বিএনপি-জামায়াত ঘরানার কর্মকর্তারা যেন সরকারবিরোধী কোনো তৎপরতা চালাতে না পারেন, সে ব্যাপারে কাজ করছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে সন্দেহভাজন কর্মকর্তাদের।

সূত্র জানায়, কয়েক স্তরে প্রশাসন সাজানোর পরিকল্পনা মোতাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি) পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদেও আস্থাভাজনদের আনতে চাইছে সরকার। আগামী নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে এসব কর্মকর্তাই মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন। তাই বর্তমান সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তারা আছেন পদায়নের বিবেচনায়।

ডিসি নিয়োগের জন্য খসড়া ফিটলিস্ট তৈরির কাজ শেষ হয়েছে। এবার ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তাদের ডিসি হিসেবে পদায়ন করা হবে। তালিকাভুক্ত কর্মকর্তাদের ব্যাপারে নিবিড়ভাবে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সংগ্রহ করা হচ্ছে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিবৃত্তও। এ ছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদনও আমলে নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনী প্রশাসন সাজানোর প্রক্রিয়া হিসেবেই গত বছরের নভেম্বরে একসঙ্গে ২৩ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৭ ডিসিকে প্রত্যাহার করে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় পদায়ন করা হয়েছে।

বিভাগীয় কমিশনার পদেও আস্থাভাজনদের আনবে সরকার। কারণ বিভাগীয় কমিশনাররাই ইউএনও এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে পদায়ন করে থাকেন। ডিসিরাও কাজ করেন তাদের অধীনে।

ইউএনও হিসেবে এবার ৩৫-৩৬ ব্যাচের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে। এই দুই ব্যাচের কর্মকর্তারা বর্তমান সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত। একইভাবে বর্তমান সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া সাব-ইন্সপেক্টররা নিয়োগ পাবেন ওসি হিসেবে।

সূত্র আরও জানিয়েছে, নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব পদেও বড় রদবদলের কথা ভাবছে সরকার। এজন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বরত সচিবদের কর্মসাফল্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দায়িত্বশীলতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়া কর্মকর্তারা সচিব পদে নিয়োগ পাবেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন বা একাধিক জেলায় ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের দেওয়া হচ্ছে অগ্রাধিকার।

এদিকে এসপি পদে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে, এমন কর্মকর্তাদের তালিকা প্রস্তুত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসপি হিসেবে নিয়োগ পাবেন ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তারা। এই ব্যাচ থেকে এরই মধ্যে কয়েকজনকে এসপি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সচিবালয় সূত্র জানায়, বিসিএসের ২৪-২৫ ব্যাচের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বিভিন্ন জেলায় ডিসি-এসপি পদে কাজ করছেন। কিন্তু তাদের নিয়োগ নিয়ে জনপ্রশাসনে অসন্তোষ রয়েছে। যদিও এই কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকে এরই মধ্যে ডিসি-এসপি হিসেবে প্রায় দুই বছর পার করেছেন। সরকার সমর্থক কর্মকর্তাদের দাবি, ২৪-২৫ ব্যাচের অল্প কয়েকজন কর্মকর্তা ছাত্রজীবনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ছাত্রসংগঠনে সম্পৃক্ত ছিলেন। বাকিদের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে নানা গুঞ্জন রয়েছে। এর ভিত্তিতে নির্বাচনের আগে এই দুই ব্যাচের বেশিরভাগ কর্মকর্তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।

তা ছাড়া দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনের বিএনপি-জামায়াত সমর্থক হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারা নানা তৎপরতা চালাচ্ছেন। ভোটের আগে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে তারা গোপনে প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করছেন। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে গুজব ও অপপ্রচার ছড়ানোর পাঁয়তারা করছেন তারা। এ ছাড়া অনিয়মে জড়িত এবং সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের ব্যাপারেও তথ্য সংগ্রহ করেছেন বিএনপি-জামায়াতপন্থি কর্মকর্তারা। তাদের এসব কার্যক্রম ঠেকাতেই সন্দেহভাজনদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে সরকারবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত কর্মকর্তারা কিছুটা আতঙ্কে পড়েছেন।

নির্বাচনী প্রশাসন সাজানোর প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্তরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রশাসনে কিছু কর্মকর্তার সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ধরা পড়েছে। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই কর্মকর্তাদের শাস্তি দিয়েই নিশ্চিন্ত হতে পারছে না সরকার। নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনকালীন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাই প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে আস্থাভাজনদের আনা হচ্ছে। তবে সরকারপন্থি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে গিয়ে যেন বিতর্ক না ওঠে, সে বিষয়টিও বিশেষভাবে আমলে নেওয়া হচ্ছে। তাই তাড়াহুড়ো না করে ভেবেচিন্তে মাঠ প্রশাসনে নিয়োগ দেওয়ার কাজ চলছে।

নির্বাচনের আগে এমন রদবদল নিয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে নিয়মকানুন মেনে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করবেন- এমন কর্মকর্তাদেরই ডিসি, এসপি, ইউএনও এবং ওসির মতো প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত। এতে দেশ ও জাতির কল্যাণ হবে। আইন মেনে দায়িত্ব পালন করবেন- এমন যোগ্যতাসম্পন্ন যেকোনো কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হোক, তাতে সমস্যা হবে না।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন বলেন, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে কর্মকর্তাদের বদলি বা পদোন্নতি দেওয়া হয় না। প্রশাসনে পদায়ন ও পদোন্নতি রুটিন প্রক্রিয়া। যারা যোগ্য ও দক্ষ, তাদের ভালো বিভাগে পদায়ন করা হয়। সেক্ষেত্রে অতীত কর্মদক্ষতাকে বিশেষ বিবেচনায় আনা হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com