নির্বাচন নিয়ে দোলাচলে ইসলামি দলগুলো

প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৪, ২০২২

নির্বাচন নিয়ে দোলাচলে ইসলামি দলগুলো

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। নির্বাচনকে নিশানা করে ইসলামি দলগুলো নিজেদের মতো কর্মতৎপরতা শুরু করেছে। ইতিমধ্যে নিবন্ধিত পাঁচটি ইসলামি দল ঘোষণা দিয়েছে, তারা এককভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচন করবে।

জোট গঠন ও আগামীর পথচলা নিয়েও আড়ালে-আবডালে নানা আলোচনা চলছে। নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় অধিকাংশ ইসলামি দল। এই ইস্যুতে পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে কর্মসূচি দেওয়ার কথাও ভাবছে তারা। বেশ কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য জানা গেছে।

ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট যেন এককভাবে বিএনপির পক্ষে না যায়, সেজন্য ক্ষমতাসীনরা হিসাব কষে এগোচ্ছে। সেই অঙ্কের অন্যতম ফ্যাক্টর ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বের করা। তাদের পৃথক জোটে রাখা বা আলাদাভাবে নির্বাচনের মাঠে রাখা।’

ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা মাওলানা লোকমানের মতে, ‘ইসলামপন্থিদের ভোট আলাদা করলে নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা পাবে ক্ষমতাসীনরা; এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। সেভাবেই গুটি সাজানো হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ইসলামি দলগুলোকে ২০ দলীয় জোট ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, আলাদা জোট গঠন করতে বা এককভাবে নির্বাচন করতে।’

২০১৩ ও ২০২১ সালে হেফাজতে ইসলামের সহিংসতার একাধিক মামলা সামনে রেখে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ ইসলামি দলগুলোকে জোট ছাড়তে চাপ প্রয়োগ করা হয়। নানা অজুহাত দেখিয়ে একে একে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়ে নিবন্ধিত ৪টি ধর্মভিত্তিক দল। বর্তমানে বিএনপি-জোটে নিবন্ধিত কোনো ইসলামি দল নেই। আছে দুটি দলের অংশবিশেষ।

একসময়ের বিএনপিঘনিষ্ঠ ইসলামি দলগুলো ২০ দলীয় জোট ছেড়ে সরাসরি আওয়ামী লীগের সঙ্গে না ভিড়লেও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সখ্য রেখে চলছে। তারা চেষ্টা করছে আলাদা জোট গড়ার। ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ একসময় বিএনপি-জোটে ছিল। এখন তারা স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়েছে। আগে থেকেই বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ স্বতন্ত্র অবস্থানে ছিল।

মরহুম শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস একসময় বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে ছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে এলে ২০০৬ সালে খেলাফত মজলিসের সঙ্গে আওয়ামী লীগ পাঁচ দফা চুক্তি করে। পরে বিতর্কের মুখে আওয়ামী লীগ সেই চুক্তি বাতিল করে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস যোগ দেয়। নির্বাচনে তাদের প্রাপ্তি নেই বললেই চলে।

২০২১ সালের মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটে। তখন হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগরের দায়িত্বে ছিলেন মাওলানা মামুনুল হক। তিনি আবার বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব। গত বছরের ১৮ এপ্রিল মামুনুল হক গ্রেপ্তার হন। দলের নেতাদের বড় একটি অংশ এখনো জেলে। কিছুদিন অচলাবস্থায় থেকে দলটি আবার তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। গুঞ্জন রয়েছে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্য আন্দোলন, ফরায়েজি আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনসহ সমমনা কয়েকটি ইসলামি দল মিলে নির্বাচনী জোট গড়তে পারে।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম-মহাসচিব মুফতি শরাফত হোসাইন বলেন, ‘আমরা এই মুহূর্তে নির্বাচন নয়, বরং আমাদের দলের মহাসচিব ও অন্য নেতাদের মুক্তির বিষয়ে কাজ করছি। মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় জর্জরিত আমাদের নেতাকর্মীরা।’ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপেও জানিয়েছি, ‘দলের মহাসচিবসহ প্রথম সারির নেতারা জেলে। তাদের রেখে কীভাবে নির্বাচন করব? তাছাড়া ভোটের পরিবেশ কেমন হবে তা না জেনে বুঝে নির্বাচনে যাওয়ার কোনো অর্থ হয় না।’

নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা কোনো জোটে যাওয়ার বিষয়ে চাপ আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মুফতি শরাফত বলেন, ‘এক ধরনের চাপ তো আছেই। জোট গঠন নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন। আমরা আমাদের মতো ভাবছি। তবে ইসলাম ও গণতন্ত্রের স্বার্থে নিজেদের অবস্থান অক্ষুণœ রেখে সমমনাদের সঙ্গে নিয়ে পথ চলতে আমাদের আপত্তি নেই। সবই নির্ভর করবে পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর।’

মরহুম মুফতি ফজলুল হক আমিনীর দল ইসলামী ঐক্যজোট ২০১৬ সালের ৭ জুন ২০ দলীয় জোট ছেড়ে যায়। তখন গুঞ্জন ছিল, আওয়ামী লীগের সমর্থনে মুফতি আমিনীর ছেলে আবুল হাসানাত আমিনীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে প্রার্থী করা হবে। শেষ পর্যন্ত গুঞ্জন গুঞ্জনই থেকে গেল। জোট ছাড়ার সময় থেকেই ইসলামী ঐক্যজোট নেতারা বলে আসছেন, আসন নিয়ে সরকারের সঙ্গে তাদের কোনো সমঝোতা হয়নি। গত ১৮ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে এককভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন তারা। ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা আশা করছি, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবে। আমরা ৩০০ আসনে এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ইসলামী ঐক্যজোট বর্তমানে কোনো জোটের অন্তর্ভুক্ত নয়।’

একসময় কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে প্রভাবশালী ছিল ইসলামী ঐক্যজোট। একাধিক সূত্র জানায়, মুফতি আমিনীর মৃত্যুর পর অন্তর্দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিরোধ প্রভৃতি বিতর্কে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এখন কওমি-অঙ্গনে দলটি আগের অবস্থানে নেই।

খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান হামিদী বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে কাজ করছি। আপাতত এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এই মুহূর্তে ইসলামি দলগুলো বড় উল্লেখযোগ্য কোনো জোটে নেই। আমাদের চিন্তা রয়েছে পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে আগামী নির্বাচনে সমমনাদের নিয়ে একটা জোট কিংবা নির্বাচনী সমঝোতা করা যায় কি না। নিবন্ধিত ৪-৫টি এবং অনিবন্ধিত ২-৩টি দলের মধ্যে কথাবার্তা চলছে। চূড়ান্ত কিছু বলার সময় এখনো আসেনি।’

রাজনৈতিক পরিম-লের বাইরে আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফ্ফুজে খতমে নবুওয়ত, শায়খুল হাদিস পরিষদ প্রভৃতি ব্যানারে বিভিন্ন দলমতের আলেমরা একত্র হচ্ছেন। সেখান থেকে নেতাকর্মীদের প্রতি ঐক্যের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শায়খুল হাদিস পরিষদের আহ্বানে রাজধানীর একটি মিলনায়তনে ‘শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের জীবন ও কর্ম’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশের ইসলামপন্থি সব দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত বক্তাদের কথায় ঐক্যের বার্তা শোনা যায়। খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আহমদ আব্দুল কাদের বলেন, ‘আমরা যদি এক হতে পারি, তাহলে কোনো বাধাই বাধা হতে পারবে না। আসুন আমরা এক হই, নেক হই।’

গত ১৫ অক্টোবর ইসলামী যুব আন্দোলন আয়োজিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীমের (পীর সাহেব চরমোনাই) রাজনৈতিক দর্শন শীর্ষক সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সমমনা বিভিন্ন ইসলামি দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এমন অরাজনৈতিক অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতাদের অংশগ্রহণ তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও রাজনীতির বিষয়ে কেউ সরাসরি মন্তব্য করেননি।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯। এসবের মধ্যে ইসলামি ও কওমি মাদ্রাসাপন্থি দলের সংখ্যা ১০। নিবন্ধনের বাইরে ইসলামি দল ও সংগঠনের সংখ্যা আরও বেশি; কোনো কোনোটি আবার রাজনীতিতে সক্রিয়। এসব দলের সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ইসলামি দলগুলো হচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত না হলেও ইসলামী ঐক্য আন্দোলন, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট ও খেলাফতে ইসলামী বাংলাদেশের কিছু সক্রিয়তা রয়েছে মাঠে-ময়দানে। এছাড়া প্যাডসর্বস্ব অসংখ্য ইসলামি দল রয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসব দল ও সংগঠনের তৎপরতা লক্ষ করা গেছে।

ইতিমধ্যে ইসলামী আন্দোলন হাতপাখা প্রতীকে, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন বটগাছ প্রতীকে, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম খেজুরগাছ প্রতীকে, ইসলামী ঐক্যজোট মিনার প্রতীকে এবং ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ চেয়ার প্রতীকে এককভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com