পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও শোক দিবস

প্রকাশিত: ৫:৪০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ৩০, ২০২২

পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও শোক দিবস

আহসান হাবিব :
একটি গণতান্ত্রিক দেশে বিভিন্ন মতানৈক্যের রাজনৈতিক দল থাকে; থাকে প্রশাসন। অপরাধ দমনের জন্য থাকে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতন্ত্র মেনেই চলতে হয়। রাজনৈতিক দলের নিয়ম-কানুনের ভেতরে থাকা যেমন জরুরি, তেমনি প্রশাসনের উচিত ধৈর্যশীল হওয়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা প্রশাসনের একটি অংশ হচ্ছে পুলিশ বাহিনী। সবকিছুরই একটা সীমারেখা আছে। রাজনৈতিক দল ও প্রশাসন সবাই সেই অলিখিত সীমাকে সম্মান করবে এটাই স্বাভাবিক।

রাজনৈতিক দলের কর্মীরা সবাই এক রকম হবে তা নয়। তারা বিভিন্নজন ভিন্ন মেজাজের হয়। প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের দেশে প্রশাসনের অসহনশীলতার অজস্র নজির আছে। মাঝে মধ্যে তাদের সহনশীলতার কথা মনেই থাকে না। যেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

গত ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে সাগরপাড়ের জেলা বরগুনায় ঘটে যাওয়া ঘটনার কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তা দেখে মানুষ আঁতকে উঠেছে। সারা দেশ এমকি বিশ্বের অনেক দেশেই এই দিবস পালিত হয়। এটা অন্য কোনো দিবস নয়, এটা জাতীয় শোক দিবস। শোক দিবসের দিন বরগুনায় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ ঠেকাতে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা চলছে সর্বত্র।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছাকে এক দল সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির বাসভবন আক্রমণ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। এছাড়াও এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছেন ফজিলাতুন্নেছার দশ বছরের ছেলে শেখ রাসেল, তার বাকি দুই ছেলে শেখ কামাল, শেখ জামাল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল এবং রোজি জামাল, ভাই আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, দেবর শেখ নাসের, ভাতিজা শেখ ফজলুল হক মণি এবং তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মণি। ওই সময় বিদেশে থাকার কারণে শুধুমাত্র তার কন্যাদ্বয় শেখ হাসিনা ওয়াজেদ এবং শেখ রেহানা প্রাণে রক্ষা পান। জাতীয় শোক দিবসের মতো একটি ঘটনায় এ ধরনের হামলা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই পুলিশকে মানবিক হওয়ার দরকার ছিল।

বরগুনায় ছাত্রলীগের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও সংসদ সদস্যের সঙ্গে বাদানুবাদের ঘটনার পর আলোচনায় আসা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহরম আলীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে নিযুক্ত করা হয়েছে। বরগুনায় জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠান স্থলে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে একপক্ষের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। লাঠিচার্জের নির্দেশ দেওয়া এবং ওই এলাকার সংসদ সদস্যের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের অভিযোগে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহররম আলীকে বরগুনা থেকে প্রত্যাহার করে বরিশাল রেঞ্জে আনলেও ঘটনার শেষ এখানে নয়। খতিয়ে দেখতে হবে এর পেছনে কোনো কারণ আছে কিনা, নতুবা একজন জনপ্রতিনিধিকে টপকে, তাকে কোনো রকম গুরুত্ব না দিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের এ কাজ করা কোনোমতেই কাঙ্ক্ষিত নয়।

এটা ঠিক যে, আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনেকাংশেই হারিয়ে গেছে। একইভাবে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের কার্যকলাপ বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের কার্যকলাপ বিভিন্ন সময় দলের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। এই দলের নেতারা এ কারণে বিভিন্ন সময় কঠোর ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। তাদের যেকোনো আচরণ নিবৃত্ত করতে একজন জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থা নিতে পারেন। প্রসঙ্গত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৭তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে ১৫ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি কমপ্লেক্সে ফুল দেন জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। এরপর কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে তারা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আলোচনা সভায় যোগ দিতে গেলে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালান। এ সময় উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে পুলিশ গণহারে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বেধড়ক লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া শিল্পকলা একাডেমি ভবনে আটকে থাকা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পেটায় পুলিশ।

ঘটনার সময় বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু উপস্থিত ছিলেন। তিনি পুলিশ কর্মকর্তার আচরণে বিস্মিত হয়েছেন। ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। তার সামনে পুলিশ যে হামলা চালিয়েছে তাতে জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠান পণ্ড হয়েছে। তেমনি এই বর্ষীয়ান রাজনীতিককে যেভাবে অসম্মান করা হয়েছে- সেটা একটা গণতান্ত্রিক দেশে প্রশাসন করতে পারে না। একজন জনপ্রতিনিধির সামনে এরকম ঘটনা ঘটিয়ে পুলিশ কী বোঝাতে চেয়েছে সেটা আমরা জানি না। তবে এটা গণতান্ত্রিক রীতির লঙ্ঘন। তারা যে নির্মম-নিষ্ঠুর হামলা করেছে বরগুনার ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা কখনো ঘটেনি।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, বরগুনা জেলা শিল্পকলা একাডেমি থেকে শোক দিবসের আলোচনা সভা শেষ করে নেতাকর্মীদের নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। শিল্পকলার গেট থেকে এমপিসহ সিনিয়র নেতারা বের হতে পারলেও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের গেটের ভেতর আটকে রাখে পুলিশ। এ সময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ছেড়ে দিতে বলেন এমপি শম্ভু। তবে এমপির সামনে এসে দাঁড়ান বরগুনা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহররম আলীসহ পুলিশ সদস্যরা। মহররম আলী এমপিকে উদ্দেশ করে হাত উঁচিয়ে বলেন, ‘ওপর থেকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আমাদের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট মারল কেন? ওইখান থেকে কেন ইট মারবে? আমরা কি অন্যায় করেছি, সেটার জবাব দিয়ে যাবেন এখান থেকে।’

এ সময় এমপি বলেন, এ ঘটনা তো নাও ঘটতে পারত। তখন মহররম আলী উচ্চস্বরে বলেন, ‘আমরা তো কিছু করি নাই।’ এমপি বলেন, ‘তাহলে আপনারা থামাইয়া দেন।’ একজন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে এ ধরনের আচরণ গর্হিত কাজ। এটা একজন পুলিশ কর্মকর্তা কিভাবে করল সেটা বোধগম্য নয়।

২০১৭ সালে রাজধানীর মৎস্য ভবনের সামনে ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট কর্তৃক দৈনিক মানবজমিনের ফটো সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা পুলিশের কর্মকাণ্ডকে ব্যাপকভাবে নিন্দিত করেছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির জন্য বাম সংগঠনগুলো সারা দেশে যে ধারাবাহিক আন্দোলন করছে সেখানেও পুলিশ অযাচিত লাঠিচার্জ করেছে। এমনকি নারীরাও বাদ যায়নি। আর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার কথা তো কিছুদিন আগের।

জাতীয় শোক দিবসের দিনে বিশেষত সংসদ সদস্যের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে বরগুনার আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ সর্বস্তরের নাগরিক ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছে। এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে প্রশাসনও হস্তক্ষেপ করতে পারে। কিন্তু বরগুনায় একজন জনপ্রতিনিধিকে কোনোরকম তোয়াক্কা না করে পুলিশ জাতীয় শোক দিবসের দিন যে আচরণ করেছে তা রীতিমতো গণতান্ত্রিক রীতিবিরোধী। প্রত্যেক পুলিশ সদস্যদের মনে রাখা উচিত তারা সাধারণ জনগণের সেবক, জনগণের দেয়া করের টাকায় তারা বেতন পান। তাই ইচ্ছা করলেই রীতির বিরুদ্ধে কাজ করা যায় না। প্রশাসনকে আরও সংযত হতে হবে। নতুবা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার বলতে কিছু থাকবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com