সংক্রমণ আরও বাড়লে আবারও সংকটে পড়বে হাসপাতাল

প্রকাশিত: ৩:৪৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০২২

সংক্রমণ আরও বাড়লে আবারও সংকটে পড়বে হাসপাতাল

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের তাণ্ডবের মধ্যেই দেশে প্রতিদিনই শনাক্ত রোগী এবং শনাক্তের হার আগের দিনকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ১২ জানুয়ারি নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৯১৬ জন। আর এ সময়ে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ১১ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে (১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ)। আর দেশে মহামারির দুই বছরের মাথায় এসে নতুন শনাক্ত হওয়া ২ হাজার ৯১৬ জনকে নিয়ে দেশে শনাক্ত রোগী ১৬ লাখ ছাড়িয়ে গেলো।

 

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম তিন জন করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হন বলে জানায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এর ঠিক ১০ দিন পর আক্রান্ত প্রথম রোগীর মৃত্যুর কথা জানানো হয়। সেই থেকে করোনার ঊর্ধ্বমুখী-নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যে দেশে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের দাপটের সময় গতবছর জুলাই-আগস্টে দৈনিক শনাক্তের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এরপর সেটা নামতে নামতে জুলাইয়ে ২ শতাংশের নিচে চলে আসে।

 

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কিন্তু এর মধ্যেই বিশ্বে শুরু হয় ওমিক্রনের তাণ্ডব। ৩ জানুয়ারি দৈনিক শনাক্তের হার ৩ শতাংশ এবং ৫ জানুয়ারি তা ৪ শতাংশ ছাড়ায়। কিন্তু এর দুই দিনের মাথায় ৭ জানুয়ারি শনাক্তের হার ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে হয় ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। ৯ জানুয়ারি শনাক্তের হার দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর পরদিন ১০ জানুয়ারি শনাক্তের হার হয় ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ১১ জানুয়ারি ছিল ৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এর ঠিক একদিনের মাথায় শনাক্তের হার গিয়ে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

 

ওমিক্রন মৃদু বলে সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা গেলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ওমিক্রনকে মৃদু ভাবা ঠিক হবে না। বিশ্বজুড়ে ওমিক্রনের তাণ্ডবের পর বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। দেশে এখন পর্যন্ত ওমিক্রনের ৩৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে এতদিন কেবল ঢাকার রোগী থাকলেও যশোরেও ওমিক্রনে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, দেশে এখন করোনা রোগীদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশই ওমিক্রনে আক্রান্ত। তাতে করে কিছুটা হলেও ওমিক্রনের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ হয়েছে।

 

এদিকে দেশে আগের সপ্তাহের তুলনায় গত এক সপ্তাহে করোনা রোগী বেড়েছে ১৬৯ শতাংশ। কয়েক দিন ধরেই করোনার সংক্রমণে উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। আর এ পরিস্থিতিকে ‘অ্যালার্মিং’ (বিপজ্জনক) বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

 

অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, ‘পুরো ডিসেম্বরে শনাক্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৫৮৮ জন, আর জানুয়ারির প্রথম ১১ দিনেই ইতোমধ্যে ১২ হাজার ৮৫০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ওমিক্রনের পাশাপাশি ডেলটা ভাইরাসও কিন্তু অবস্থান করছে। সংক্রমণ হঠাৎ করে মাত্রাতিরিক্ত হয়ে গেলে ধরে নিতে হবে নতুন ভ্যারিয়েন্টেই সংক্রমণ বেশি হচ্ছে।

 

করোনায় যদি এভাবে রোগী বাড়তে থাকে তাহলে সেটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে জানাচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। হাসপাতালের বেড সংকট, চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার ফলে ফের দেশের ডেল্টা পরিস্থিতির মতো অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।

 

খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। যদি রোগী সংখ্যা তিন থেকে চারগুণ হয়ে যায় তাহলে কিন্তু খুব বেকায়দায় পড়তে হবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘আমরা ২০ হাজার বেড প্রস্তুত করেছিলাম। রোগী যদি ১ লাখ হয় তাহলে কোথায় থাকবে? প্রত্যেকটা দেশের একটা সক্ষমতা আছে। আমরা যতই বাড়াই সব কিছুর লিমিট আছে।’

 

দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে করোনা রোগীদের চাপ বেড়েছে। সেখানে সাধারণ রোগীদের ভর্তি নেওয়া অনেকটাই বন্ধ হওয়ার পথে। রোগী বাড়ছে অন্যান্য হাসপাতালেও।

 

রোগী বাড়লে হাসপাতালসহ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়বে জানিয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ওমিক্রনে গুরুতর রোগী সংখ্যা কম হচ্ছে। কিন্তু ওমিক্রনে যদি মোট রোগী সংখ্যা বাড়ে তাহলে গুরুতর রোগীর সংখ্যাও আনুপাতিক হারে বাড়বে। আর গুরুতর রোগী ছাড়া যে হাসপাতালে রোগী যাবে না বা যায় না, তাতো নয়। যারা বয়স্ক, যারা আগে থেকেই অন্য রোগে আক্রান্ত, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম—তারাতো অবশ্যই হাসপাতালে যাবে।’

 

‘ফর প্রিকোশান, ফর মনিটরিং’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগী সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের দেশেও অনেক রোগী হয়ে গেলে হাসপাতাল ব্যবস্থা সংকটে পড়বে।’

 

ওমিক্রন দ্রুত ও অধিকসংক্রমণশীল হওয়ায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়তে বাধ্য বলে জানিয়েছেন অধিদফতর গঠিত পাবলিক হেলথ কমিটির সদস্য ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. আবু জামিল ফয়সাল। ওমিক্রন কতটা ছড়াচ্ছে, সেটা দেশের প্রতিদিনের সরকারি হিসাব থেকেই টের পাওয়া যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যদিও আমি বিশ্বাস করি এর বাইরেও অসংখ্য রোগী রয়েছে।’

 

আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘দেশে এখনও করোনা রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর হার কম। কিন্তু আশঙ্কার কথা হচ্ছে, যেকোনও সময়ে এটা বেড়ে যেতে পারে। সেইসঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি, হার্ট ডিজিস ও ক্যানসারের মতো যারা জটিল রোগে আক্রান্ত, তারাও কিন্তু এতে সংক্রমিত হবেন। আর তাদের ক্ষেত্রে এটা মারাত্মক হবে। তখন তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা লাগবে, তাদের ছাড়াও হাসপাতালে যাবেন অসংখ্য মানুষ। সে ক্ষেত্রে হাসপাতালের ওপর আবার চাপ বাড়বে, ডেল্টার সময়ের মতো আইসিইউর চাহিদা বাড়বে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com