“বাংলাদেশে অবস্থানরত হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দের প্রতি খোলা চিঠি”

প্রকাশিত: ৬:৪৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৪, ২০২২

“বাংলাদেশে অবস্থানরত হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দের প্রতি খোলা চিঠি”

এডভোকেট মোঃ আমান উদ্দিন:
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা ইমানী দায়িত্ব। যে ধর্মেরই হউক না কেন সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী হওয়া উচিত। সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ট আখেরী নবী তাজাদারে মদিনা জনাব মোহাম্মদুর (সঃ) বিদায় হজ্জের ভাষনে বলেছেন, “ধর্ম নিয়ে বাড়া বাড়ী করতে নেই” আমরা মুসলমানগন সে নবীর উম্মত।

 

সুতরাং ধর্মান্ধ না হয়ে সম্প্রীতিতে বিশ্বাসী। হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান বন্ধুগণ যেমনি তাদের স্বগোত্রে জন্মগ্রহন করে উত্তরাধীকারী হিসাবে সে ধর্ম লালন পালন করবে। ঠিক মুসলামানগন মুসলিম পিতা-মাতার ঘরে জন্মগ্রহন করে স্ব-স্ব ধর্ম পালন করবে। এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে আমরা প্রত্যেকেই সাম্প্রদায়িক।

 

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সমাবেশে বলে থাকেন “ ধর্ম যার যার উৎসব সবার ”। হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ধর্মাবলম্বীরা কি মুসলমানদের কোন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। যেমন: মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। যোগ দেন নাই। না দেওয়ারই কথা। এখানে বিশ্বাসের সাথে অমিল রয়েছে। পক্ষান্তরে হিন্দুদের বড় ধর্মীয় উৎসব হলো দুর্গা পুজা, খৃষ্টানদের বড় উৎসব “ক্রিসমাস ডে” বৌদ্ধদের বড় ধর্মীয় উৎসব হলো “বৌদ্ধ পুর্নিমা” এসব অনুষ্ঠান পালন করার জন্য সরকার রাষ্ট্রীয় ভাবে সাধারন ছুটি ঘোষনা করে সম্মানীত করেছেন।

 

 

অথচ মুসলমানগণ সেসব অনুষ্ঠানে সক্রিয় সহযোগীতা করে থাকেন। অথচঃ পাশের দেশ ভারত মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করান জন্য রাষ্ট্রীয় কোন স্বীকৃতি নেই। বরঞ্চ নিষেধাজ্ঞা আছে। যেমন কিছু দিন পূর্বে ভারতের আসাম প্রদেশে মুসলমানগন ৫ কি.মি. ভিতরে কোন হালাল পশু জবাই ও বহন করা সম্পুর্ন নিষিন্ধ করে আইন করেছে। বহন করতে দেখলে হিন্দু পুরহিতকে ৭ বছরের সাজা প্রদান করান ক্ষমতা প্রদান করেছে সরকার কর্তৃপক্ষ।

 

 

গত ৩১/১২/২০২১ইং তারিখে প্রথম আলো পত্রিকার শিরোনাম হিসেবে দেখলাম: সাবেক ৫জন ভারতের প্রতিরক্ষা প্রধান সরকারের কাছে খোলা চিঠি লিখেছেন, “ভারতের হিন্দু সংসদ” ঘোষনা দিয়েছে মুসলমানদের হত্যা করান জন্য। এ ব্যাপারে বি.জে.পি সরকারকে মুসলমানদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনের আহবান জানিয়েছেন। কিন্তু সরকার কি কোন ব্যবস্থা নিবে? না, কিছুতেই না। কারন এ সরকারের উত্থানই হয়েছে মুসলমানদের বাবরী মসজিদ ধ্বংস ও গুজরাটের মুসলমানদের গনহত্যা বা জেনসাইডের মধ্য দিয়ে। বলা হয় থাকে ১৯৭১ সালে ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীনতা অর্জনে সাহায্য করেছে। ইতিহাসবিদরা বলে থাকেন, ভারত তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ বাস্তবায়নে সহযোগীতা করেছে মাত্র। বাংলাদেশ যদিও স্বাধীন কিন্তু ভারত প্রতিক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভ্যান্তরীন ব্যপারে খবরদারী করে থাকে। যা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সম্ভব নহে।

 

 

কাশমিরে মুসলমান নিধনের মহযজ্ঞ চলছে। অথচ বাংলাদেশে অবস্থানরত হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান নেতৃবৃন্দ কেন কথা বলছেন যেমন- সরকারী চাকুরী থেকে শুরু করে যে কোন পদে যোগদানে কোন সুযোগ নেই। অথচ বাংলাদেশে সরকারী অফিস আদালতে প্রায় ৬০% হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান। মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগ হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান । উল্লেখকরন প্রয়োজন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের বর্তমান সচিব হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সিলেটের আইনজীবিরা রায়হান হত্যা মামলায় বিবাদীদের পক্ষে কোন আইনজীবি তাদেরকে সহায়তা করেন নি, করবে ও না, কিন্তু কুখ্যাত কিলার, শত মানুষের হত্যাকারী, মদদ দানকারী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী মেজর (অব:) মিনহা হত্যা মামলার প্রধান আসামী ওসি প্রদীপকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য সুপ্রীম কোর্টের বিজ্ঞ আইনজীবি, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারন সম্পাদক এডভোকেট আনা দাস গুপ্ত, চট্টগ্রামের কোর্টে উপস্থিত হয়ে সব ধরণের আইনি সহায়তা দিচ্ছেন। কিছু দিন পূর্বে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালকের স্ত্রী ‘প্রিয়া সাহা’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে দেখা করে নালিশ দিলেন এবং বললেন তাদের জান মালের নিরাপত্ত নেই। এখানে কি বাংলাদেশের ভাবমুর্তী ক্ষুন্ন হয় নাই? তার বিরুদ্ধে তো রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হতে পারতো। কিন্তু কেন হয়নি জানিনা।

 

 

বাংলাদেশে অবস্থানরত হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ভাইরা কোন কিছুতে সামান্য ব্যত্যয় ঘটলে জোরালে প্রতিবাদ দেখি। কিন্তু পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের বা নিজ দেশে অবস্থান করে দেশের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোদের বিরুদ্ধে কি কোন প্রতিবাদ করেছেন কখনও। না, করেননি। না করারই কথা। সরকারকে চাপে রেখে অধিকার আদায়ের কৌশলী ভুমিকা পালন করে থাকেন। উচিত ছিল প্রতিবাদ করার। সম্প্রীতি শুধু একপক্ষ থেকে পালন করলে সেটা সম্প্রীতি হয় না। উভয় পক্ষ সম্প্রীতির বন্ধনে অবদ্ধ হলে যে কোন জাতি উন্নতি লাভ করবে এটা স্বাভাবিক।

 

 

একটি উদাহরন দিতে চাই। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হচ্ছে, তারই ধারাবাহিকতায় বিয়ানীবাজারের সকল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হল। সুন্দর ও সুষ্ট নির্বাচন হয়েছে। ভাল শিক্ষিত, মার্জিত প্রার্থীরাই নির্বাচিত হয়েছেন। আমার জানামতে কোন সহিংস ঘটনা ঘটেনি। শান্তিপূর্ন সহ অবস্থানে, আনন্দ উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে নির্বাচন সম্পূর্ন হয়েছে। জনগন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পেরেছেন। সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বিয়ানীবাজারস্থ ৮নং তিলপারা ইউনিয়ন বাসী। প্রার্থী ছিলেন ৭জন। এর মধ্যে মুসলমান প্রার্থী ছিলেন ৬জন। যিনি নির্বাচিত হয়েছেন তার নাম মাহবুবুর রহমান। শিক্ষাগত যোগ্যতা বি.এ। এ বছর পাশ করে অত্র ইউনিয়নে হ্যাট্টিক করেছেন। তার সমর্থকরা আনন্দ উল্লাস করিতেছে। ভোট পেয়েছেন ১৩ হাজারের মধ্যে প্রায় তিন হাজার পাঁচশত ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বদ্ধি হয়েছেন বাবু বিবেকনন্দ দাস। পেশায় আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ী। শিক্ষাগত যোগ্যতা ৯ম শ্রেনী। ভোট পেয়েছেন প্রায় দুই হাজার সাতশত ভোট। ১৩ হাজার ভোটের মধ্যে প্রায় সাত শত ভোট হিন্দু সম্প্রদায়ের। অবশিষ্ট ভোট দিয়েছেন মুসলমান গন। এখানে কি সম্প্রীতি অনুপস্থিত। না, সম্প্রীতি বিরাজমান। অতীত অভিজ্ঞতা বিশ্লেষন করলে দেখা যায় ১৯৯৭-২০২১ইং পর্যন্ত তাদের অধ্যুষিত এলাকা থেকে কেহ ৯, ২১, ১৩৪ ইত্যাদি ভোটের দাবীদার হয়েছেন মুসলমানগন। যে এলাকা থেকে তাকে মুসলমানগন প্রায় দুই হাজার ভোট দিয়েছেন, অত্র এলাকার লোকজন কখনও তাদের এলাকা থেকে ভোট পাননি। এরপরও এত বিশাল ভোটে তাকে এগিয়ে এনে প্রতিদ্বন্ধিতার তালিকাভুক্ত করেছেন। উচিত ছিল সবাইকে শ্রদ্ধা জানানো, সমালোচনা- নহে।

 

ভারত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা স্থপতি মহাত্বা গান্ধী বলেছেন “আমার ধর্মের কোন নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখা নেই, আমার ধর্মের ভিত্তি হচ্ছে মানুষের ভালবাসা আর অহিংসা”। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, “তব মসজিদ মন্দিরে নাই কোন মানুষের দাবী। মুল্লা পুরহিত লাগাইছে সকল দুয়ারে চাবি।”

 

 

পরিশেষে বলতে চাই সাম্প্রদায়িক বিবেক সৃষ্টি না করে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হউন। দেশকে ভালোবাসুন। কেননা দেশ প্রেম ঈমানের অংশ। প্রতিবেশী দেশ ভারতকে বলুন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাঁ হাঙ্গাঁমার সৃষ্টি না করে বাংলাদেশের নীতি অনুসরন করুন এবং প্রত্রিকার বিবৃত্তি বক্তৃতার মাধ্যমে ভারতের সকল অন্যয় কাজের প্রতিবাদ করুন।

 

আরও বলুন ভারতের স্থপতি মহাত্মা গান্ধীর নীতি আদর্শ বাস্তবায়ন করতে। কংগ্রেস সরকার ছিল ধর্ম নিরপেক্ষ কিন্তু বর্তমান সরকার কি সে নীতি লালন এবং পালন করছে।

লেখক,সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন, বিয়ানীবাজার, সিলেট।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

আর্কাইভ

January 2022
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com