বাংলাদেশে আরবি ভাষাচর্চার নানা দিক

প্রকাশিত: ১:৩৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৮, ২০২১

বাংলাদেশে আরবি ভাষাচর্চার নানা দিক

আবদুল আজিজ :
আজ ১৮ ডিসেম্বর। আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবস। ২০১২ সাল থেকে এ দিবসটি বিশ্বব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে আরবি ভাষাচর্চা নিয়ে কয়েকটি কথা বলতে চাই—

এক. আরবি ভাষার একেবারেই প্রথম পাঠ হলো শুদ্ধ উচ্চারণে ২৯টি হরফ পড়তে পারা। এরপর দেখে দেখে পড়ার স্তরে উন্নীত হওয়া। নামাজ শুদ্ধ হয় মতো পাঁচ-দশটি সুরা সহিহ তিলাওয়াতে মুখস্থ থাকা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আরবি এই স্তর পর্যন্ত হলেই প্রশংসনীয়। কিন্তু বাস্তবতার আয়নায় সমাজের চিত্র খুবই বেদনাবিধুর। এক-দুটি হরফ ছাড়া বাকি হরফগুলোর উচ্চারণ কানে শোনার মতো না। সঠিকভাবে সালামটাও যেন শিখতে মানা। জানাজার নামাজের দোয়া, দোয়া কুনুত, তাশাহহুদ, দরুদ শরিফ—বার কয়েক অনুশীলনের পরও সঠিক উচ্চারণে পাঠ করা দুরূহ থেকে যায়। কোরআনের শেষ ১০টি সুরার মধ্যে চার-পাঁচটি সুরা পারে না—এমন মুসল্লি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হলেও শুদ্ধ উচ্চারণ যে আনকা পাখি—বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ এই কয়েকটি জিনিসের ওপর নির্ভর করে ব্যক্তির সারা জীবনের নামাজের শুদ্ধাশুদ্ধি। নামাজ শুদ্ধ হওয়ার প্রথম শর্তই হলো কিরাত শুদ্ধ হওয়া। সারা দুনিয়ার সব ‘নলেজ’ অর্জন করলেও এক চিমটি সময় কোরআনের জন্য, আরবি হরফগুলোর শুদ্ধ উচ্চারণের জন্য ব্যয় করতে যেন বয়সের ভারে খুবই ক্লান্ত হয়ে উঠি আমরা!

দুই. সাধারণ শিক্ষিত শ্রেণির বিশাল অংশ দ্বিনমুখী হচ্ছেন, কোরআনকে ভালোবাসছেন, যার ফলে আরবি ভাষাও তাঁদের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছে—খুবই আনন্দের সংবাদ এটি। একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক আরবি ভাষা সেন্টার। ব্যক্তিগত পড়াশোনা কিংবা জরুরি অনেক কাজ ফেলে, অফিস টাইম থেকে সময় বের করে অনেকেই কোরআনের মর্ম বোঝার জন্য সেখানে ছোটেন। রপ্ত করেন যোগাযোগের আরবিটাও। গোলটা বাধে তখন যখন তাঁরা এতটুকুতেই পরিতৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। দ্বিন শিখে ফেলেছি, আরবির পণ্ডিত স্তরে পৌঁছাতে আর বাকি কিসের—ভেতরের এমন এক ভাবের প্রকাশ ঘটিয়ে খ্যাতির রোদ্দুরে ফুলে-ফেঁপে উঠতে চান। টানা ১০-১২ বছর দিন-রাত এক করে, হাজারো কাঠখড় পুড়িয়ে, সরাসরি ওস্তাদের সান্নিধ্য পেয়ে যাঁরা কোরআন-হাদিসের ইলম অর্জন করেছেন—অল্প কয়েক দিনের চর্চায় নিজেকে তাঁদের সমমানের ভাবতেও অকুণ্ঠ বোধ করেন। অথচ দিব্যি ভুলে বসেছেন, তাঁদের স্তর এখনো ওয়ান পয়েন্টে ঠায় স্থির। ‘আরবি ভাষা কূল-কিনারাহীন সমুদ্র’—হাজার বছরের প্রায় সব মনীষীর এই মহা সত্য উচ্চারণটুকু অনুধাবনে আসেনি। অনুরোধের পৃষ্ঠাটা মেলে ধরতে সমস্যা কী—নাহু, সারফ, বালাগাতসহ আরবির প্রায় ১৪টি মৌলিক বিষয়ে এবং সেসবের সব শাখায় সরব পদচারণ, ধারাবাহিক শিক্ষার্জন, পাশাপাশি সান্নিধ্যের সৌরভ গ্রহণ—এসবের পর যদি কিঞ্চিৎ ইলম শিখেছি বলে মনে হয়—হতে পারে। আরবি ভাষার গভীর জ্ঞান লাভ করা ছাড়া দ্বিনি ইলমের নাগাল পাওয়া যেমন আকাশকুসুম স্বপ্ন, তেমনি শুধু কয়েকটি শব্দ আওড়ে আরবি ভাষা শিখে ফেলার মানসিকতাও পরিবর্তনযোগ্য।

 

তিন. আন্তর্জাতিক অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষা আরবি। এ সুবাদে দেশের স্বনামধন্য ঐতিহ্যবাহী সব ইউনিভার্সিটিতেই আরবি ভাষা বিভাগ আছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আরবিতে অনেক গবেষণাপত্র বের হয়। আরবি ভাষার অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয়ে থিসিস হয়। বাংলাদেশের আরবি ভাষার নানা সমস্যা ও সমাধান নিয়ে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে সময়ে সময়ে অনলাইন-অফলাইনে সভা-সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এগুলো ইউনিভার্সিটির আরবি ভাষাবিষয়ক কার্যক্রমের অংশ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূলত তারাই দেশের আরবি ভাষাঙ্গনের প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু ইউনিভার্সিটির সম্মানিত দায়িত্বশীলরা যখন সেমিনারে বিদেশি কোনো মেহমানের সামনে কথা বলেন, সত্যিই আমরা মস্তকাবনত হই। আরবি হরফগুলোর উচ্চারণ অশ্রবণযোগ্য হয়ে পড়ে। বাক্য কাঠামোর থাকে বেহাল অবস্থা! এক শব্দের বদলে বেরিয়ে যাচ্ছে আরেক শব্দ, ঘটে যাচ্ছে অর্থে-মর্মে আমূল পরিবর্তন! অথচ এই মানুষগুলোই যখন অনর্গল ইংলিশ বলে যান, চোখ ওপরে উঠে যায়—কী স্মার্ট উচ্চারণ, ভাষা ও অঙ্গভঙ্গি! আরবি ভাষার প্রতি এ কেমন অবিচার!

চার. বাংলাদেশে আরবিচর্চার মূল কেন্দ্র বলা যায় কওমি মাদরাসাগুলোকে, যেখানে শিশুর প্রথম সবকই হলো আরবি ২৯টি হরফ শুদ্ধ করা। এরপর তিন-চার বছরের ভেতর কোরআনুল কারিম দেখে পড়া এবং মুখস্থ করে ফেলার পর্ব সম্পন্ন করা। এরপর শুরু হয় ১০-১২ বছরের নিয়মতান্ত্রিক একাডেমিক পড়াশোনা। সেখানে প্রথম শ্রেণি থেকেই সূচনা হয় আরবির মূল চর্চা। শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করা, শত শত ক্রিয়া মুখস্থ করা, এবং আরবি ব্যাকরণের বিশাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়া—সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ বছরের দীর্ঘ যাত্রা। এরপর দুই বছর ব্যয় হয় আরবি অলংকারশাস্ত্র—বালাগাতের পাঠ-পঠনে। কওমি মাদরাসায় এত দীর্ঘ সময় আরবির পেছনে ব্যয় করার উদ্দেশ্য শুধু আরবির গভীর জ্ঞান অর্জন করা এবং তার সিঁড়ি বেয়ে কোরআন ও সুন্নাহর অতল গহিনে প্রবেশ করা। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে লক্ষণীয়, শিক্ষাজীবনের এত দীর্ঘ সময় ব্যয় করে শিক্ষার্থীদের ভাষার শুধু একটি দক্ষতা—‘পঠন’ কোনোমতে তৈরি হয়। বাকি তিনটি দক্ষতা—‘লিখন, শ্রবণ, কথন’ অধরাই থেকে যায়। কারো যদি আরবি বলা বা লেখার হাত দক্ষ হয়ে ওঠে, তা নিতান্তই ব্যক্তি উদ্যোগের ফল কিংবা কোনো নিষ্ঠাবান, স্নেহপরায়ণ শিক্ষকের কৃতিত্ব। অথছ ১০-১২ বছর প্রলম্বিত একটি মহৎ জাতীয় শিক্ষা সিলেবাস থেকে জাতির পাওয়ার থাকে আরো অনেক কিছু। তাই যুগের চাহিদা বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের যোগ্যতর করে গড়ে তুলতে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগী হওয়া এখন সময়ের দাবি।

পাঁচ. যেকোনো ভাষার মতো আরবি ভাষারও রয়েছে মৌলিক চারটি দিক—শ্রবণ, কথন, পঠন ও লিখন। আরবি ভাষা শেখা মানেই এই চার দক্ষতায় দক্ষ হওয়া। আবার অন্যান্য ভাষার মতো আরবি ভাষারও রয়েছে ব্যাকরণতত্ত্ব, অলংকারশাস্ত্র, ভাষাবিজ্ঞান ও ইতিহাস। কোরআন, সুন্নাহ, ফিকহ, হাদিস এবং মূলনীতিগুলো বোঝার জন্য এসবের বিকল্প নেই। পূর্ণাঙ্গরূপে ভাষার সর্বদিক আয়ত্ত করা সম্ভব; তবে সহজসাধ্য না। তাই কোনো ক্ষেত্রে কারো কমতি পরিলক্ষিত হলে দোষের কিছু নেই। কিন্তু যার যার অঙ্গনে আরবি ভাষা যতটুকু বিস্তার পাওয়ার যোগ্য, যদি নিজেদের অবহেলায় তা বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে অবশ্যই তা দুঃখজনক। দায়িত্বশীলদের সেখানে ভাবনার অবকাশ থাকে প্রচণ্ড আকারে!

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com