১ ডিসেম্বর ঢাকা শহর ছিল অবরুদ্ধ

প্রকাশিত: ৯:৩৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০২১

১ ডিসেম্বর ঢাকা শহর ছিল অবরুদ্ধ

প্রজন্ম ডেস্ক:

একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় আক্রমণ ও গণহত্যা চালানোর পর শুরু হয় বাঙালির সশস্ত্র স্বাধীনতার লড়াই। ১৯৪৭-এর দেশভাগে ১৪ আগস্ট এবং ১৫ আগস্ট পাকিস্তান এবং ভারত দুটি স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা পায়। পাকিস্তান বিভক্ত থাকে পূর্ব এবং পশ্চিম এই দুই নামে। শেষ পর্যন্ত এই বিভক্তির চূড়ান্ত পরিণতি আসে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর, বাংলাদেশ স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ^ মানচিত্রে রূপ লাভ করার মধ্যদিয়ে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এই দীর্ঘ সময় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি পূর্ব পাকিস্তানকে শাসন ও শোষণ করেছে। পূর্বপাকিস্তানের জনসাধারণ একসময় বুঝতে পেরেছিল, আলাদা হয়ে যেতে হবে! অর্থাৎ পাকিস্তানি শাসকদের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। এই দীর্ঘ সময়ে আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের অধিবাসীরা গণতান্ত্রিক দাবি আদায়ে সোচ্চার থেকেছে। ’৪৭-এ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ, ’৬৬-এর ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন বাঙালিদের একত্রিত ও অধিকার আদায়ে আরও বেশি মরিয়া করে তুলেছিল।

তবে এই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির মূল লক্ষ্য ছিল ঢাকাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা। পাকিস্তানি শাসনামলে পূর্বপাকিস্তানের সকল আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্র ছিল ঢাকা। তাই ঢাকাকে কবজায় রাখাই ছিল শাসকদের মূল লক্ষ্য। ২৫ মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা শুরু করার পর এর বিরুদ্ধে বাঙালি সেনা, ইপিআর, পুলিশ, ছাত্র, যুবা, শ্রমিক ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের স্বাধীনতাকামী নারী-পুরুষের সহযোগিতায় যে বিশাল মুক্তিবাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল তারাই জন্ম দিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের। তবে ২৫ মার্চের নারকীয় হামলার পর ঢাকা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই শুরু হয় প্রতিরোধ সংগ্রাম। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হামলা রুখে দিতে ঢাকায় শুরু হয় প্রতিরোধ। পাড়ায় পাড়ায় এলাকাভিত্তিক গণপ্রতিরোধবাহিনী গড়ে ওঠে পাকিস্তানি শাসকদের কামান-গোলা আর মেশিনকে চ্যালেঞ্জ করে। তবে একটি সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা খুব একটা কার্যকর হয়নি।

মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু করে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর বাঙালির মধ্যে নতুন প্রেরণা তৈরি হয়। মার্চ থেকে শুরু করে ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের বিকেল পর্যন্ত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ঢাকা শহরকে নিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র করে। বিশেষ করে, ২৫ মার্চের কালরাত্রির পরে কারফিউ জারি করা হয়। এরপর মার্চ থেকে শুরু করে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন কায়দায় কারফিউ দিয়ে, কারফিউ তুলে নিয়ে ঢাকা শহরকে নিজেদের হাতে রাখতে চেয়েছিল। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেখানোর চেষ্টা চালানো হয়েছিল যে, ঢাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে! এখানে একদল বিচ্ছিন্নতাবাদী শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গ করার পাঁয়তারা করছে! তবে পাকিস্তানি বাহিনীর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। সেই সময়ে ঢাকার চিত্র জানা যায় জাহানারা ইমামের লেখা ‘একাত্তরের দিনগুলিতে’। ১ ডিসেম্বর তারিখে তিনি তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘আটদশ দিন হল কেরোসিন উধাও বাজার থেকে।’ এ থেকে বোঝা যায়, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিশ^দরবারে ঢাকার অবস্থাকে যতই স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল, আদতে ঢাকা ছিল একটি অবরুদ্ধ শহর। এরপরও বিশ্ববাসী জেনে যায় ঢাকায় ২৫ মার্চের ভয়াবহ কালো অধ্যায়ের কথা, গণহত্যার কথা। একটি দেশের প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একটি ভূখন্ডের অধিবাসীদের স্বাধীনতার দাবিতে লড়াই-সংগ্রামের খবর ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববাসীর কাছে।

১ ডিসেম্বর লন্ডনের পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশ সমস্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রকাশিত হয়। বিশেষ করে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরাগান্ধী ৩০ নভেম্বর রাজ্য পরিষদের বক্তব্যে ভারতের অবস্থান পরিষ্কার করে তুলে ধরেন। ‘দি টাইমস’ এবং ‘দি ডেইলি টেলিগ্রাফ’ প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, উচ্চ পরিষদে অনুষ্ঠিত এক বিতর্কে অংশগ্রহণ করে মিসেস গান্ধী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে পাকিস্তান সৈন্যবাহিনীর উপস্থিতি ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে তিনি মনে করেন। প্রতিবেশী দেশে গণহত্যা ভারতের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। নিরস্ত্র জনগণকে নিশ্চিহ্ন করা হলে তারা নিষ্ক্রিয় থাকতে পারেন না। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান যদি ভারতের প্রতি শান্তির হস্ত প্রসারিত করতে চায়, তাহলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সদিচ্ছার প্রমাণ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে তার সৈন্যবাহিনী প্রত্যাহার করতে পারে।

১ ডিসেম্বর ‘দি টাইমস’-এর আরেক সংবাদে বলা হয়, ৩০ নভেম্বর রাত্রিবেলা এক টিভি সাক্ষাৎকারে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম বলেন, আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে ভারতীয় সৈন্যবাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে পূর্ববঙ্গে পবেশ করতে পারবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আর্কাইভ

January 2022
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com