ওলিকুল শিরোমণি হজরত শাহ জালাল (রহ.)

প্রকাশিত: ২:০৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৬, ২০২১

ওলিকুল শিরোমণি হজরত শাহ জালাল (রহ.)

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান:

এ দেশে ইসলামের সুমহান বাণী প্রচারে ওলি-আউলিয়া, পীর-মাশায়েখ অনন্য অবদান রেখেছেন। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এ দেশের মানুষ ইমানের চেতনায় উজ্জীবিত হয়েছে। শিরক ছেড়ে দিয়েছে। তাওহিদ ও একত্ববাদকে ইমানের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। যাদের পদধূলিতে এ ভূমি পূর্ণতা পেয়েছ-সেই ওলি-আউলিয়াদের প্রাণপুরুষ হজরত শাহজালাল (রহ.)। যাকে ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত সুফি-দরবেশ বলা হয়। যার আগমনে এ মাটি প্রাণ পেয়েছে। ইমানের বীজ গ্রথিত হয়েছে মানুষের চিন্তা ও মননে। সেই মহান প্রবাদ পুরুষ ৬৭১ হিজরিতে প্রাচীন আরব ও আজমের হেজাজ ভূমি তৎকালীন ইয়েমেন প্রদেশের কুনিয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন। যার পুরো নাম শেখ শাহ জালাল উপনাম মুজাররদ।

তার বাবা শায়খ মুহাম্মদ (রহ.)। মা সৈয়দা ফাতিমা হাসিনা সাইদা। মাত্র তিন মাস বয়সে তিনি মাকে হারান। বাবাও চলে যান পাঁচ বছর বয়সে। তার লালন পালনের দায়িত্ব পড়ে মামা হজরত সৈয়দ শায়খ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দী (রহ.)-এর ওপর। হজরত শাহ জালাল (রহ.) তার মামা ও শিক্ষাগুরু শায়েখ সৈয়দ আহমদ কবির সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে আরবি ভাষায় কুরআন-হাদিস শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামের প্রাথমিক অনুশাসনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। পরে মামা আহমদ কবির হজরত শাহ জালাল (রহ.) কে ইয়েমেন থেকে মক্কায় নিয়ে যান। পবিত্র মক্কা শহরে আহমদ কবিরের একটি আস্তানা ছিল, সেখানে তিনি অন্য শিষ্যদের সঙ্গে ভাগ্নেকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলেন। তিনি ইসলামি শরিয়ত ও মারেফাত উভয় ধারার শিক্ষায় শিক্ষিত হন।

পারিবারিক সূত্রে হজরত শাহ জালাল (রহ.) একটি দরবেশ পরিবারে জন্ম নিয়েছেন। পিতা একজন ধর্মানুরাগী মুজাহিদ। যিনি ইয়েমেনে ধর্মযুদ্ধে নিহত হন। মাতুলের দিক থেকে সৈয়দ বংশের প্রখ্যাত দরবেশ সৈয়দ জালাল সুরুখ বোখারির দৌহিত্র। অন্যদিকে আহমদ কবির তার মামা। যাকে শিক্ষা গুরু হিসাবে পান। তিনিও সে সময়ের একজন প্রখ্যাত দরবেশ। এক কথায় তিনি একটি আধ্যাত্মিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।

হজরত শাহ জালাল (রহ.) মাত্র ৩২ বছর বয়সে ৭০৩ হিজরি মোতাবেক ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে দ্বীন প্রচারের উদ্দেশে সিলেটে আসেন। তার আগমনের কারণ সম্পর্কে জানা যায়, একদিন হজরত শাহজালাল (রহ.) স্বপ্নে দেখলেন মহানবি (সা.) তাকে তৎকালীন ভারতবর্ষের গৌড় রাজ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য আদেশ দিলেন। তিনি এ স্বপ্নের কথা তার মামা সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.) কে বলেন। এ কথা শোনার পর সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.) হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর হাতে এক মুঠো মাটি দিলেন। আর বললেন, ‘যে স্থানের মাটির রং ও গন্ধ এ মাটির সঙ্গে মিলে যাবে সেখানেই তুমি অবস্থান গ্রহণ করবে। আর দ্বীন প্রচারের কাজ শুরু করবে।’ ভারতবর্ষে গমনের উদ্দেশে তিনি তার মামা সৈয়দ আহমদ কবির (রহ.)-এর দোয়া নিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য আরবের মক্কা থেকে বিদায় নিলেন।

তার এ দীর্ঘ যাত্রাপথে অনেকেই তার সফরসঙ্গী হয়। মুরিদ হয়। এদের নিয়ে হজরত শাহজালাল (রহ.) ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লি এসে পৌঁছলেন। তখন তার সঙ্গে ছিল ৩৬০ জন সাথী। ভারতবর্ষে পৌঁছার পর তিনি সবার আগে খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করলেন। অতঃপর সুলতানুল মাশায়েখ হজরত নিজামউদ্দীন আউলিয়া (রহ.)-এর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। বিদায়কালে হজরত নিজামউদ্দীন আউলিয়া (রহ.) হজরত শাহজালাল (রহ.) কে দুই জোড়া কবুতর উপহার দেন। যা জালালি কবুতর নামে সুপরিচিত।

উপমহাদেশের একজন বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক হজরত শাহজালাল (রহ.)। যিনি সিলেট এলাকাসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ইসলাম ধর্ম প্রচারে কাজ করেছেন। তার দাওয়াতকালীন উত্তম ব্যবহার ও গুণাবলিতে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। যে ধারাবাহিকতায় এ দেশের মানুষের মনে ইসলাম অদ্যাবধি একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।

একপর্যায় যখন সঙ্গী-সাথির সংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে গেল তিনি সিলেটে আস্তানা তৈরি করলেন। তার সাহচর্য লাভ করার জন্য দূরদূরান্ত থেকে লোকজন ছুটে আসত। তিনি ধর্মপ্রিয় এ মানুষগুলোকে ইসলামের জীবন বিধান সম্পর্কে বুঝিয়ে দিতেন। একই সঙ্গে শিষ্যদের তিনি বিভিন্ন স্থানে ধর্ম প্রচারের জন্য পাঠিয়ে দেন। যে কারণেই তিনি সুদূর ইয়েমেন থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। ইসলামের এ নিবেদিত প্রাণ ১৫০ বছর বয়সে ১৩৪৭ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। সিলেটেই তাকে সমাহিত করা হয়। তার মাজার সিলেট সদরের অন্তর্গত। স্থানীয়ভাবে এটিকে দরগা এলাকা বলা হয়। আর প্রবেশ পথটিকে বলা হয় দরগা গেট।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com