এক দিনে তিন গুণী লেখককে হারাল দেশ

প্রকাশিত: ৬:৪৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২১

এক দিনে তিন গুণী লেখককে হারাল দেশ

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

আগস্ট বড় নিষ্ঠুর মাস। এই মাসে শোক প্রকাশের ফুরসতও পাচ্ছেন না সাহিত্যের মানুষগুলো। একই দিনে তিন-তিনজন লেখক অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন। কথাসাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী, থ্রিলার ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের অন্যতম লেখক ও অনুবাদক শেখ আবদুল হাকিম এবং রম্যলেখক আতাউর রহমান। এই তিনজন লেখককে হারিয়ে দেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

 

টুকা কাহিনীর বুলবুল চৌধুরী

ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে জীবনের যতি টানলেন কথাশিল্পী বুলবুল চৌধুরী। তাঁর আর লেখা হবে না শৈশবকে অবলম্বন করে আত্মজৈবনিক উপন্যাস। ক্যান্সারে শয্যাশায়ী হয়েও যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন। কথাসাহিত্যিক বুলবুল চৌধুরী শনিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর পুরান ঢাকার বাংলাবাজারের বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।

গত ফেব্রুয়ারিতে ক্যান্সার ধরা পড়ে বুলবুল চৌধুরীর। চিকিৎসা চলছিল বাসায়ই। কেমোথেরাপি শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় সেটা আর সম্ভব হচ্ছিল না। চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই শিল্পীকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন।

গত মে মাসে বুলবুল চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ছোটবেলার গ্রামের স্মৃতি নিয়ে লিখতে চান ‘মেঘমেদুর ছোটবেলা’। মিষ্টি মধুর ছোটবেলা, যে ছোটবেলাটা গ্রামের। শুধু গ্রামের নয়, পুরো মাটির, বিবর্তনের। তাঁর বিশ্বাস, লিখতে পারলে, এটা শুধু তাঁর আত্মজীবনী নয়, বাংলাদেশেরও একটা আত্মজীবনী হবে। আরো জানিয়েছিলেন, ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজার কাহিনি নিয়েও লিখতে চান একটি অনবদ্য উপন্যাস। এ নিয়ে দীর্ঘ সময় তিনি কাজও করেছেন। ক্যান্সারের কষ্ট ভুলে কাজ দুটি নিয়ে চাঞ্চল্যবোধ করছেন। কিন্তু সেসব আর হলো না।

অতিসাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত বুলবুল চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৬ আগস্ট গাজীপুরে। পড়ালেখা করেছেন সেই সময়ের জগন্নাথ কলেজে। প্রথম লেখা বের হয় ১৯৬৭ সালে। জগন্নাথ কলেজে গল্প লেখা প্রতিযোগিতায় ‘জোনাকি ও সন্নিকট কেন্দ্র’ গল্পের জন্য দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। পেশাজীবনের শুরুতে পুরান ঢাকায় ছাপাখানার ব্যবসা ছিল তাঁর। পরে দীর্ঘ সময় সংবাদপত্রে কাজ করেছেন।

সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম আখ্যানকার বুলবুল চৌধুরী। গ্রামবাংলার কাদামাটি মাখা জীবনের ছবি যিনি তুলে আনেন নিজস্ব মহিমায়। তাঁর গল্পের ভাষা সরল, আঙ্গিক প্রচলিত। সেসবের মাঝে গল্প আছে। আবার কিছু গল্প রূপকধর্মী কবিতার মতো রহস্যপ্রবণ। সব কথা তিনি বলতে চান না, পাঠকের কল্পনা আর অনুভবের মাঝে ছেড়ে দেন।

‘টুকা কাহিনী’ গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি সাহিত্য জগতে সাড়া জাগান। এরপর লিখেছেন ‘মাছের রাত’, ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’, ‘জলঢুঙ্গী’সহ নানা গ্রন্থ। তাঁর বেশির ভাগ গল্পই সত্য ঘটনা অবলম্বনে। লিখেছেন আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘অতলের কথকতা’। প্রকাশিত হয়েছে ‘নির্বাচিত গল্প’ গ্রন্থ।

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জসীমউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার, ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার প্রভৃতি।

বুলবুল চৌধুরীর মরদেহ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আজ সকাল ১১টায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে রাখা হবে।

রহস্যময় জগতের শেখ আবদুল হাকিম

গত শতকের ষাটের দশক থেকে দেশ-বিদেশে মিশন করে বেড়াচ্ছে মাসুদ রানা। দুর্ধর্ষ, দুঃসাহসী গুপ্তচর। পাকিস্তান আমলে ভারতের অসংখ্য কূটপরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে রানা, উড়িয়ে দিয়েছে তাদের দুর্গম দুর্গ, ভারতের কবল থেকে উদ্ধার করেছে বন্দি গুরু মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খানকে। আবার মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধ করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে, মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে সেই রাহাত খানকেই আবার বাঁচিয়ে এনেছে পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে। বাংলাদেশের তুমুল জনপ্রিয় থ্রিলার ‘মাসুদ রানা’র স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন হলেও ‘মাসুদ রানা’ সিরিজটিকে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন শেখ আবদুল হাকিম। এ দেশের পাঠকের কাছে রহস্য উপন্যাসের এক বিশাল জগৎ তৈরি করে দেওয়া শেখ আবদুল হাকিম সাত দশকের জীবনপরিক্রমা শেষে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন।

গতকাল দুপুর ১টায় রাজধানীর মাদারটেকের নন্দীপাড়ায় বড় মেয়ের বাড়িতে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তিনি ছেলে শেখ পুলক হাসান, দুই মেয়ে শেখ সাদিয়া হাকিম ও শেখ আপালা হাকিমের জনক ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ফরিদা বেগম ছয় বছর আগে ইন্তেকাল করেছেন।

আপালা হাকিম জানান, আবদুল হাকিম দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টের রোগী ছিলেন। গত মাসে বক্ষব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে মাসখানেক চিকিৎসাধীন ছিলেন। গতকাল দুপুরের দিকে অনেকটা আকস্মিকভাবেই দ্রুত অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই তিনি মারা যান। বাদ মাগরিব নন্দীপাড়া মসজিদে তাঁর জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর নন্দীপাড়া কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

শেখ আবদুল হাকিমের জন্ম ১৯৪৬ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। দেশভাগের পর তাঁরা ঢাকায় চলে আসেন। গত শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে দেশের অন্যতম প্রকাশনা সংস্থা সেবা প্রকাশনীর সঙ্গে যুক্ত হন পেশাদার লেখক হিসেবে। কাজী আনোয়ার হোসেনের নির্দেশনায় সেবা প্রকাশনীর জনপ্রিয় রহস্য উপন্যাস সিরিজ ‘কুয়াশা’ দশম কিস্তি থেকে শুরু করে নতুন নতুন পর্ব লিখতেন। এরপর যুক্ত হন ‘মাসুদ রানা’ সিরিজ লেখার সঙ্গে। নেপথ্যেই ছিলেন তিনি। ‘গোস্ট রাইটার’ হিসেবে প্রতিটি পাণ্ডুলিপির জন্য সম্মানী পেতেন। লেখক হিসেবে নাম ছাপা হতো কাজী আনোয়ার হোসেনের। ২০১৯ সালে এসে বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করেন শেখ আবদুল হাকিম। গত বছর বাংলাদেশ কপিরাইট কার্যালয় এক রায়ে জানিয়েছে, কুয়াশা সিরিজের ৫০টি বই এবং ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের প্রথম ১১টি বইয়ের পর ২৬০ পর্ব পর্যন্ত বইগুলোর লেখক শেখ আব্দুল হাকিম। রায়ের বিরুদ্ধে কাজী আনোয়ার হোসেন উচ্চ আদালতে আপিল করায় বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে।

এ দেশের যে কয়জন লেখক লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম শেখ আবদুল হাকিম। স্বনামেই অনুবাদ করেছেন বিশ্বের বহু জনপ্রিয় লেখকের রোমাঞ্চ উপন্যাস। মৌলিক উপন্যাসের মাধ্যমেও বিপুল পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেন। বিশেষ করে তাঁর অনুবাদে মারিও পুজোর ‘গডফাদার’ এ দেশের পাঠকসমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

রম্যলেখক আতাউর রহমান

বাংলাদেশ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক ও বরেণ্য রম্যলেখক আতাউর রহমান আর নেই। গতকাল শনিবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

আতাউর রহমান করোনায় আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছুদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর। ১৯৪২ সালে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের নগর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দুই ছেলে, স্ত্রীসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

আতাউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪ সালে ইংরেজিতে অনার্স এবং ১৯৬৫ সালে এমএ পাস করেন। কিছুদিন সিলেটের মদনমোহন কলেজ ও এমসি কলেজে শিক্ষকতা করেন। পরে তৎকালীন পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিএসপি অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। চাকরিজীবনে তিনি লন্ডন ও রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসে বাণিজ্যিক ও কূটনীতিক দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মহাপরিচালক পদ থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ২৫টি গ্রন্থ রয়েছে।

গতকাল বাদ মাগরিব গ্রামের বাড়ি গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ মাদরাসা মাঠে জানাজা শেষে নিজ জন্মভূমি নগর গ্রামে তাঁর লাশ দাফন করা হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com