ইতিহাস কি এতই নিষ্ঠুর?

প্রকাশিত: ১:২২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২১

ইতিহাস কি এতই নিষ্ঠুর?

এডভোকেট মোঃ আমান উদ্দিন:
স্বাধীনতা যুদ্ধের মহানায়ক সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দিন আহমদ, এম.এ.জি ওসমানী, জিয়াউর রহমান, আ.স.ম. আব্দুর রব, কাদের সিদ্দিকীরা। হালের রাজীতিতে তাদেরকে ইতিহাসের খলনায়ক হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলিতেছে। বলা বাহুল্য, আমার জন্ম ১৯৬৯ সালের ২৭শে ডিসেম্বর। সুতরাং স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বেশী বাড়াবাড়ি লিখবনা। তবে বিবেকের তাড়নায় চাপা ক্ষোভ প্রকাশ সময়ের দাবী। ১৯৭১ সাল।

 

 

 

অস্থায়ী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমদ। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন এম.এ.জি. ওসমানী। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একটি শৃংখলা বাহিনীর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন জিয়াউর রহমান। শৃংখলা ভেঙ্গে কালুর ঘাটকে তার কেন্দ্র থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা করলেন এবং বললেন We revolt। দেশ যদি স্বাধীন না হত তাহলে নিশ্চিত দেশ দ্রোহীতার মামলায় অভিযুক্ত হতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আ.স.ম আব্দুর রব সহ কথিত ৪ খলিফা স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সুবজের পতাকা উত্তোলন করলেন। কাদের সিদ্দিকি বেসামরিকদের পক্ষে স্বশস্ত্র যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লেন। পেলেন বীর উত্তম খেতাব। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক দিন হচ্ছে ৭ই মার্চ। শেখ মুজিবুর রহমান ভাষণ দিলেন। ভাষণটি ইতিহাস স্বীকৃত সেরা ভাষণ।

 

 

 

তিনি বলেছিলেন যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে ঝাপিয়ে পড়–ন। এটাই হয়তো রেসকোর্স ময়দানে আমার শেষ ভাষণ। জনগণ উদ্বুদ্ধ হলো। যার যার অবস্থান থেকে শত্রæদের মোকাবিলা করতে ঝাপিয়ে পড়লো। লক্ষ লক্ষ মানুষ শহীদ হলো। মা বোন তার সম্ভ্রম হারালো। ৯ মাস রক্তময়ী সংঘর্ষ হলো। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্টী গ্রেফতার করলো। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পূর্ব পর্যন্ত উপরে উল্লেখিত ব্যক্তিগণই অস্থায়ী সরকারের নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে উপহার দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদেরকে সার্বিক সহযোগীতা করেছেন পূর্ব পাকিস্তানের অন্তত ৯৮% মানুষ। এরা সহযোগীতা করেছে বিবেকের তাড়নায়। পদ পদবীর লোভে নয়। ভাতার আশায় বিশেষ কোটা থেকে চাকুরী বা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা গ্রহণের জন্য নহে। প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধারা কখনও তাদের নাম গেজেটে প্রকাশিত হউক তারা কিন্তু তা চান না। ইতিহাস স্বীকৃত কিছু ব্যক্তি বাদে অতি চতুর ব্যক্তিরা প্রশিক্ষণের নামে ভারতে আয়েশী জীবন অতিক্রম করে যুদ্ধ শেষ হলে দেশে ফিরে আসেন এবং সরকারি খাতায় নাম লিপিবদ্ধ করেন।

 

বেতন ভাতা, অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি হওয়ায় অসৎ পন্থা অবলম্বন করে, মুক্তিযুদ্ধা তালিকায় নাম লিপিবদ্ধ করণের প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। অসাধু ব্যক্তিরা কিন্তু এর সুযোগ নিচ্ছেন। তারা তাদের ব্যবসা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধা কার্ডটি ঝুলিয়ে রাখেন। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের থেকে অবৈধ সুযোগ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন।

 

শহীদুল্লা কায়ছারের মেয়ে শমী কায়ছার। মুক্তিযুদ্ধার (শহীদ) মেয়ে হিসাবে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। খুশীতে আত্মহারা। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক প্রধান অথিতির অনেক প্রশংসা করলেন। তার কাছ থেকে শমী কায়ছার সংবর্ধনার স্মারক গ্রহণ করবেন। কি আশ্চর্য! তাকে দেখেই চিনে ফেললেন। তার পিতা এবং তাদের অনেক আত্মীয় স্বজনকে হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আল বদর, আল শামছ, রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার ছিল সেই প্রধাণ অতিথি। শমী কায়ছার সংবর্ধনার স্মারকটি গ্রহণ না করে প্রধাণ অতিথির উপর রাগে ক্ষোভে আচড়ে মেরে ফেলেন।

 

বিয়ানীবাজারের কৃতি সন্তান শেখ ওয়াহিদুর রহমান। তিনি ছিলেন রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতি কর্মী, লেখক এবং দানশীল ব্যক্তিত্ব। তার বিখ্যাত উক্তিটি হচ্ছে “ জাল বায় ওয়াহিদে, আর মাছ খায় নাহিদে”। রাজনীতিতে প্রতিদিন নীতিবাক্য শুনতে হয়, হাছান মাহমুদ গংদের কাছ থেকে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাহারা কোথায় ছিল? তারাই আওয়ামীলীগ দলটি দখল করে, হালুয়া রুটির ধান্ধায় মশগুল। এদের চরিত্র বড়ই নিষ্ঠুর। স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বঙ্গঁবন্ধু যেদিন স্বপরিবারে ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ সালে নিহত হলেন। তৎকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর প্রধান কে.এম. শফিউল্লাহ বিমান বাহিনীর প্রধান, বিমানবাহিনীর প্রধান ছিলেন এ.কে. খন্দকার এবং রক্ষীবাহিনীর প্রধাণ ছিলেন তোফায়েল আহমদ। বঙ্গবন্ধু হত্যা কান্ড থেকে বাঁচানোর জন্য আকুতি জানালেন । কিন্তু কেহই সহযোগীতা দিতে এগিয়ে আসেননি। সবার একই উত্তর আমরা পরিস্থিতির শিকার। অবিসংবাদিত নেতার জানাযায় মাত্র ১৩ জনের উপস্থিতি। তা কি মেনে নেওয়া যায়? মোটেও না।

 

 

অনেকে বলার চেষ্টা করেছিলেন, খন্দকার মুশতাক তো আমাদের দলের মানুষ। অনেকে তার মন্ত্রীসভার সদস্য হওয়ার জন্য চেষ্টা করলেন। হতে পারেননি। লজ্জা লাগে! এসব দায়িত্বশীলরা এখনও আওয়ামীলীগের এম.পি, মন্ত্রী বা নেতা পরিচয় দিয়ে আনন্দ উপভোগ করে থাকেন। তখন কেন হাছান মাহমুদরা দেশের অবিসংবাদিত নেতার পাশে দাড়াননি? চাটুকাররা কখনও সৎ সাহসী হয় না। হাসানুল হক ইনু গংরা ট্যাংকে দাড়িয়ে বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হওয়ায় আনন্দ উল্লাস করেছেন। আজ তিনি আওয়ামীলীগের বিভিন্ন বিষয়ে মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করিতেছেন।

 

 

১৯৭৫ সালে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী’ই ছিলেন একমাত্র সেই নির্মম হত্যার প্রতিবাদের মূর্ত প্রতীক। তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে কাদেরীয়া বাহিনী গঠন করেছিলেন। কিন্তু আজকে হাছনরা প্রায়ই বলেন এরা নাকি সবাই মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ‘তকমা’ দিয়ে থাকেন। কি নির্মম উপহাস ! সরকারের রোষানল থেকে বাঁচতে ভারতে বাঘা কাদের সিদ্দিকী প্রায় এক যুগ অবস্থান করতে হয়েছে।

 

 

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা প্রবাসে ছিলেন। সে হিসাবে ভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে যান। তাহারা কিন্তু আওয়ামীলীগের দায়িত্বশীল পদে ১৯৮১ সালের পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন না। তাদের পিতার হত্যাকারীদের ডানে বায়ে এখনও বীরদর্পে অবস্থান করে পরামর্শ দিয়ে দলকে উপকৃত করার চেষ্টা করছে। আশা ছিল, শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণের সাথে সাথে তাদের বিচার করবেন। কিন্তু করেননি। তবে কথার ফাঁকে একদিন বলে ফেলছেন, আমার কোন দুর্দিন এলে, আপনারা কেহ পাশে থাকবেন না এটা নিশ্চিত। যেমনটি থাকেন নি আমার পিতার পাশে।

 

 

 

প্রধানমন্ত্রীকে নিজের পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে, ইতিহাসের মহানায়ক সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজ উদ্দিন আহমদ, এম.এ. জি ওসমানী, জিয়াউর রহমান, আ.স.ম. আব্দুর রব ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীকে যথাযোগ্য মর্যাদা না দিয়ে নব্য চাটুকাররা খলনায়কের চরিত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করিতেছে, যা কখন সুফল বয়ে আনবে না। বরং বুমেরাং হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। নতুন প্রজন্মের কাছে এই মহানায়কদের ইতিহাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজানা। আশা ছিল সরকার ও ইতিহাসবিদরা তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করবেন কিন্তু করেননি।

লেখকঃ সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বিয়ানীবাজার ও কলামিষ্ট।

সংবাদটি শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com