প্রকাশনার ১৫ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৫শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
১০ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
১৯শে মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

সোনা পাচার চক্রে জড়িত ১৩৭৫ জন, ১০ বছরে জব্দ আড়াই হাজার কেজি

admin
প্রকাশিত জুন ১৩, ২০২৪, ০৬:২৮ অপরাহ্ণ
সোনা পাচার চক্রে জড়িত ১৩৭৫ জন, ১০ বছরে জব্দ আড়াই হাজার কেজি

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

দেশে অবৈধ সোনা আসে দুবাই, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে। সেই সোনার ৯০ শতাংশই সাত জেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাচার হচ্ছে ভারতে। এই পাচারের সঙ্গে জড়িত আছেন ১ হাজার ৩৭৫ জন। তাঁদের কেউ কারবারি, কেউ পৃষ্ঠপোষক, কেউবা বাহক। একাধিক বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সোনা চোরাচালানে জড়িতদের এই তালিকা করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশ মূলত আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালান চক্রের ট্রানজিট রুট। সোনা পাচারকারীদের চক্র ছড়িয়ে আছে দেশে-বিদেশে। সীমান্ত এলাকায়ও আছে পাচারকেন্দ্রিক চক্র। ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যার পর সীমান্তের পাচার চক্র আলোচনায় এসেছে। খবর অনুযায়ী, তিনি একটি চক্রের নিয়ন্ত্রক ছিলেন। কয়েকটি চালানের ২০০ কোটি টাকার সোনা মেরে দেওয়া নিয়ে দ্বন্দ্বে তিনি গত ১৩ মে ভারতের কলকাতায় খুন হয়েছেন।

 

সোনা ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) ধারণা, আকাশপথ, সমুদ্রপথ ও স্থলপথে দেশে প্রতিদিন চোরাচালানের মাধ্যমে কমপক্ষে ২৫০ কোটি টাকার সোনার অলংকার ও বার ঢুকছে। এ হিসাবে বছরে প্রায় ৯১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বা তারও বেশি সোনা অবৈধভাবে দেশে ঢুকছে।

 

দেশে বৈধ-অবৈধ সোনা প্রবেশের মূল পথ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কিছু আসে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে। এ দুই বিমানবন্দরের কাস্টমস সূত্র বলছে, ২০২২ সালে বৈধভাবে দেশে ৪৬ লাখ ভরি সোনা এসেছে। তবে তাঁদের ধারণা, এ সময় অবৈধভাবে এসেছে প্রায় ৯৮ লাখ ভরি সোনা।

গত ১০ বছরে বিমানবন্দরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), পুলিশ এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ২ হাজার ৫৮৩ কেজি সোনা জব্দ করেছে। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় চোরাই সোনার চালান জব্দের ঘটনা বাড়ছে। গত পাঁচ বছরে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি আটক করেছে ৫৪৫ কেজি সোনা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় যে পরিমাণ সোনা ধরা পড়ছে, পাচার হচ্ছে তার কয়েক গুণ বেশি। বিমানবন্দর থেকে অবৈধ সোনার চালান বের করতে অর্থের বিনিময়ে সহযোগিতা করেন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যাঁরা সোনাসহ ধরা পড়েন, তাঁরা প্রায় সবাই বাহক। কারবারি ও চক্রের পৃষ্ঠপোষকদের নাম প্রকাশ পায় না। হোতারা ধরা না পড়ায় সোনা চোরাচালানও বন্ধ হয় না।

 

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, সারা দেশে সোনা চোরাচালানের ৬৩১টি মামলার তদন্ত চলছে। এ ছাড়া সোনা পাচারের গডফাদারদের বিরুদ্ধে ২১টি মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে বছরের পর বছর পার হলেও এসব মামলার তদন্তে অগ্রগতি কম।

 

সিআইডির প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোহাম্মাদ আলী বলেন, সোনা চোরাচালানের অধিকাংশ মামলা সিআইডি তদন্ত করছে। সিআইডির কাছে কারবারিদের তালিকা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। মাফিয়াদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত চলছে।

 

এমপি আনোয়ারুল আজীম হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী আক্তারুজ্জামান শাহীন শীর্ষ একজন সোনা চোরাকারবারি। তিনি ভারতে সোনা পাচার করতেন। কমিশনের বিনিময়ে এতে সহযোগিতা করত বন্ধু আনোয়ারুলের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি চক্র। চক্রটি বিভিন্ন সময় কয়েকটি চালানের ২০০ কোটি টাকার সোনা আটকের কথা বলে মেরে দেওয়ার পর শাহীন অন্য চক্র বেছে নেন। এসব নিয়ে দ্বন্দ্বেই এমপি খুন হয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, দেশে সোনা পাচারকারী মাফিয়াদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী শফিকুল ইসলাম শফিক ওরফে ‘গোল্ডেন শফি’। নব্বইয়ের দশকে ফেরি করে গামছা বিক্রি করা শফি কাস্টমস কর্মকর্তাদের পক্ষে হত্যা মামলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে তাঁদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এই সখ্য কাজে লাগিয়ে তিনি একপর্যায়ে গড়ে তোলেন সোনা চোরাচালানের নেটওয়ার্ক। সোনা চোরাচালানোর সঙ্গে জড়িত অন্য বড় কারবারিদের বেশির ভাগই তাঁর শিষ্য ও চক্রের সদস্য। শফির বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনের একটি মামলা তদন্ত করছে সিআইডি।

 

সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরের নামও আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, শফির অন্যতম সহযোগী মনির। ২০২০ সালের ২১ নভেম্বর মেরুল বাড্ডার বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। তাঁর বাসা থেকে বিপুল সোনা উদ্ধারের মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সম্প্রতি তিনি খালাস পেয়েছেন।

 

মন্ত্রণালয়ের তালিকায় সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত হিসেবে নাম আছে চট্টগ্রামের আবু আহমেদের। সূত্র বলছে, তিনি চট্টগ্রামে সোনা চোরাচালানের গডফাদার। তাঁর ৭২১ কোটি ১৭ লাখ টাকার সম্পদের খোঁজ পেয়েছে সিআইডি। সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট এ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে আদালতে।

 

সোনা চোরাচালান ও মানি লন্ডারিং মামলা নিয়ে কাজ করা সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের সাবেক বিশেষ সুপার হুমায়ূন কবির বলেন, সোনা চোরাচালানের হোতারা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। তারা এমন একটি ব্যবস্থা করেছে, যাতে আগামী ১০ বছর চক্রটি একইভাবে চোরাচালানের কাজ করতে পারবে।

 

 

যেভাবে চালান বিমানবন্দর পার করে কারবারিরা

 

দেশে বার, অলংকার ও তরলভাবে সোনা ঢুকছে। কখনো কখনো প্রবাসী যাত্রীদের মাধ্যমে সোনা পাঠায় চক্র, আবার কখনো কখনো উড়োজাহাজের আসনের নিচে বা অন্য কোথাও সোনা রাখে তারা। শাহজালাল বিমানবন্দরের একাধিক সংস্থা ও কাস্টম কর্মকর্তাদের সূত্র বলছে, বিদেশ থেকে আসা উড়োজাহাজ যাত্রী নামানোর পর ১১ ও ১২ নম্বর পার্কিংয়ে চলে যায়। সেখানে রোস্টার অনুযায়ী থাকা চোরাচালানি চক্রের লোক উড়োজাহাজে উঠে ওই সোনা নিয়ে আসে। তারা বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং বিভাগের কর্মী। পরে চক্রের সদস্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীর মাধ্যমে ৮ নম্বর গেট দিয়ে ওই সোনা বাইরে বের করে আরেক বাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। বড় চালান হলে উত্তরার একটি ভবনে যায়। সেখানে চালান ভাগাভাগি হয়। চালান সীমান্তে পৌঁছানোর কাজে যুক্ত হয় চক্রের অন্য সদস্যরা।

 

দীর্ঘদিন বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালন করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সোনা চোরাচালানের তথ্য বিমানবন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা আগে থেকেই জানেন। তাঁরা কমিশন নিয়ে চালান পার করে দেন। বিমানবন্দর থেকে তাঁদের কেউ অন্যত্র বদলি হলেও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মাসোয়ারা পান তিনি। তবে এই অসাধু কর্মকর্তাদের নজর এড়িয়েও সোনার চালান বের হয়। অবশ্য তাঁদেরই কেউ পুরো টাকা একা নিতে এই কাজ করেন।

 

সাত জেলার সীমান্ত দিয়ে পাচার

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, ভারতে সোনা পাচারের জন্য প্রধানত যশোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা ও পঞ্চগড়—এই সাত জেলার সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করা হয়। বেশি পাচার হয় যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোল দিয়ে। ঢাকা থেকে বিভিন্ন দলের বাহকের মাধ্যমে সোনা পৌঁছে যায় সীমান্ত এলাকায়। পরে সেখানকার চক্র সোনা ভারতে পাচারে সহযোগিতা করে। সীমান্তের চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে প্রভাবশালীরা। এমপি আনোয়ারুল খুনের পর সোনা পাচারের পথ হিসেবে ঝিনাইদহ সীমান্তের নামও এসেছে।

 

ঢাকার বিমানবন্দর থেকে সোনা কীভাবে ভারতে পাচার হয়, তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন দীর্ঘদিন সোনা বহন করা একজন গাড়িচালক। সোনার চালান নিয়ে ধরা পড়ায় তাঁর নামে কয়েকটি মামলাও রয়েছে। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মার্চে দুবাই থেকে নেপাল হয়ে ঢাকার বিমানবন্দরে আসা ৭৫ ভরি অবৈধ সোনার একটি চালান তিনি উত্তরা থেকে গাড়িতে করে যশোরের শার্শা সীমান্তে পৌঁছে দিয়েছিলেন। পরে চালানটি ভারতে পাঠানো হয়। তাঁর গাড়িতে ট্র্যাকার লাগিয়ে পুরো যাত্রাপথ নজরদারিতে রেখেছিলেন ওই অঞ্চলে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সোনা চোরাকারবারি শেখ শফিউল্লাহ। পুলিশের খাতায় তিনি এখন পলাতক।

 

ওই গাড়িচালকের তথ্য অনুযায়ী, অবৈধ সোনা ঢাকা থেকে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে কয়েকটি দল কাজ করে। এক দল আরেক দলের কথা জানে না। সবাই টাকা পায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্যরাও টাকা পায়। টাকা নিয়ে মতবিরোধ হলেই চালান ধরা পড়ে।

 

বেনাপোল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন ভক্ত বলেন, পুলিশ মাঝে মাঝে চালানসহ বাহককে আটক করে। কিন্তু বাহকেরা চালানের বিষয়ে তেমন কিছু জানে না। বেশি হলে তার আগের ধাপ পর্যন্ত বলতে পারে।

 

সীমান্তে বিজিবির অভিযানেও সোনা আটক হচ্ছে। বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, অবৈধভাবে সীমান্ত ব্যবহার করে কোনো অপরাধীকেই চোরাকারবার করতে দেবেন না তাঁরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন।