প্রকাশনার ১৫ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৩ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
৭ই জিলহজ, ১৪৪৫ হিজরি

সাগরে তাপ বাড়ছেই ঝুঁকিতে জীববৈচিত্র্য

admin
প্রকাশিত
সাগরে তাপ বাড়ছেই ঝুঁকিতে জীববৈচিত্র্য

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

টানা ১৩ মাস ধরে মহাসাগরগুলোর তাপমাত্রা রেকর্ড পরিমাণে বাড়ছে। প্রতিদিনই তা আগের দিনের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থাকে সমুদ্র ও জলবায়ুবিজ্ঞানীরা ভয়াবহ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এভাবে তাপমাত্রা বাড়ার ফলে অনেক সামুদ্রিক প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। আর এটা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে।

 

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) মাসিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গত ১০ মে সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।

ইউরোপের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের (সিথ্রিএস) তথ্য উল্লেখ করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এপ্রিল ছিল বৈশ্বিক তাপমাত্রার উষ্ণতম রেকর্ডে টানা ১১তম মাস। আর সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ১৩ মাস ধরে অব্যাহতভাবে বাড়ছে। বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এপ্রিলে ৬০ ডিগ্রি দক্ষিণ ও ৬০ ডিগ্রি উত্তরের গড় ছিল ২১ দশমিক শূন্য ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ওই মাসের রেকর্ডে সর্বোচ্চ। তবে গত মার্চের রেকর্ডকৃত ২১ দশমিক শূন্য ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে সামান্য কম। ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি।

এসব তথ্য উল্লেখ করে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৫০ দিন ধরে বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করেছে। মূলত উষ্ণায়নের গ্যাসগুলো এর জন্য দায়ী। তবে এল নিনো সমুদ্রকে উষ্ণ করতে সাহায্য করেছে। বর্তমানে এল নিনো কিছুটা দুর্বল হতে থাকলেও সমুদ্রের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশিই রয়েছে। অতি উত্তপ্ত মহাসাগরগুলো সামুদ্রিক জীবনচক্রেও প্রভাব ফেলছে। প্রবাল ব্লিচিং শুরু হয়েছে। অথচ বহু দশক ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মহাসাগরগুলো পৃথিবীর ‘গেট আউট অফ জেল কার্ড’ হিসেবে কাজ করছে।

কার্বন ডাই-অক্সাইডের এক-চতুর্থাংশ শোষণ করে সমুদ্র

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষ যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করে তার এক-চতুর্থাংশ মহাসাগরগুলো শোষণ করে। বিশেষত এক বছর ধরে সমুদ্রপৃষ্ঠ যে তাপ অনুভব করছে, তা মোকাবিলায় লড়াই করছে।

সাগরের গুরুত্ব সম্পর্কে ডব্লিউএমওর আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবহন করা হয় সাগরপথে। ৬০ হাজার কার্গোজাহাজে বছরে ১১ বিলিয়ন টন পণ্য বহন করা হয়। এ ছাড়া ১৯০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় সোয়া একশ বছরে বিশ্বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়েছে ১৫ সেন্টিমিটার।

মহাসাগরগুলোতে কবে থেকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে তা উল্লেখ করে সিথ্রিএসের তথ্যে বলা হয়েছে, গত বছরের মার্চ মাস থেকে বৈশ্বিক মহাসাগরের গড় পৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদি আদর্শ মানের চেয়ে বেশি হারে বাড়তে শুরু করেছে। আগস্ট মাসে তা অনেক বেড়েছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে সমুদ্রপৃষ্ঠের দৈনিক গড় তাপমাত্রা ২১ দশমিক শূন্য ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল।

গত বছরের ৪ মে থেকে প্রতিদিনই উষ্ণতা বৃদ্ধির রেকর্ড ভেঙেছে। কিছুদিন ব্যবধান বিশালও হয়েছে। প্রায় ৪৭ দিনে বছরের ওই দিনের রেকর্ড অন্তত শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ভেঙেছে। অথচ স্যাটেলাইট যুগে রেকর্ডের ব্যবধান এত বিশাল ছিল না। সবচেয়ে বড় রেকর্ড ভাঙার দিনগুলোর মধ্যে ছিল ২৩ আগস্ট ২০২৩ ও চলতি বছরের ৩ ও ৫ জানুয়ারি।

ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের অধ্যাপক মাইক মেরেডিথ এ ব্যাপারে বলেছেন, সত্যি বলতে কী সমস্ত তাপ সমুদ্রে যাচ্ছে। এটি কিছু ক্ষেত্রে আমরা যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও বেশি দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি একটি বড় উদ্বেগের কারণ। এসব পরিবেশের বাস্তব লক্ষণ অথচ আমরা এটি হতে দিতে চাই না। যদি এমন অবস্থা চলতে থাকে তা হবে ভয়াবহ পরিণতি।

তাপমাত্রা বৃদ্ধি সামুদ্রিক প্রাণিজগতে কি প্রভাব ফেলছে

মানুষের দ্বারা সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক প্রাণিজগতের ওপর যথেষ্ট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ঋতুচক্রও পরিবর্তন হয়ে যায় বলে গত ১৫ মার্চ নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালে প্রকাশিত দ্য এমার্জিং হিউম্যান ইনফ্লুয়েন্স অন দ্য সেশনাল সাইক্লোন অব সি সারফেস টেম্পারাচার শীর্ষক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে।

তাতে বলা হয়, সাম্প্রতিক উষ্ণতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিণতি হলো বিশ্বব্যাপী কোরাল বা প্রবালের ব্যাপক ব্লিচিং। প্রবাল ব্লিচিং হলো সেই প্রক্রিয়া, যখন সিম্বিওটিক শৈবাল এবং সালোকসংশ্লেষক রঙ্গকগুলোর ক্ষতির কারণে প্রবাল সাদা হয়ে যায়। রঙ্গকটির এই ক্ষতি বিভিন্ন চাপের কারণে হতে পারে যেমনÑ তাপমাত্রা, আলো বা পুষ্টির পরিবর্তন।

গবেষণায় আরও বলা হয়, অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ সমুদ্রগুলো শীতলতম মহাদেশের সমুদ্রগামী প্রাণীগুলোকেও ক্ষতি করছে। সেসবের মধ্যে রয়েছে ইম্পেরিয়র (সম্রাট) পেঙ্গুইন।

অধ্যাপক মেরেডিথের ভাষায়, ইম্পেরিয়রের ছানাগুলো এসব স্থান থেকে পালানোর সময় সমুদ্রের বরফ ধসে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইম্পেরিয়র পেঙ্গুইন একটি বিপন্ন প্রজাতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য সমুদ্রের বরফ গলা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধিই দায়ী। তা ছাড়া সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে যুক্তরাজ্যের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে বেশ কিছু প্রাণী সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে গেছে। তার মধ্যে কিছু বার্নাকল প্রজাতি অন্যতম।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশীদ বলেন, গত এপ্রিল মাসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খুবই উত্তপ্ত মাস ছিল। এ সময় যে শুধু ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেশি ছিল, তা নয় বরং মহাসাগরগুলোর তাপমাত্রাও বেশি ছিল। বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা মাপার ক্ষেত্রে আমাদের ডেপথ অবজারভেশন নেই। তাই বিভিন্ন মডেল ডেটা ব্যবহার করে থাকি।

তিনি আরও বলেন, সাগরের তাপমাত্রা বেশি থাকলে সাধারণত সাইক্লোন হয়, কিন্তু এবারের এপ্রিলে তা হয়নি। তার কারণ সাইক্লোনের জন্য ৪টি শর্ত প্রয়োজন। তার মধ্যে রয়েছে সাগরের তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি ও লো লেভেল সার্কোলেশন (সমুদ্রে ঘূর্ণি) ৪০ ডিগ্রি থাকতে হবে। এবার লো লেভেল নয়, শুধু হাই লেভেল ছিল। সাইক্লোন হওয়ার ক্ষেত্রে ছোট ছোট ঘূর্ণি থাকতে হয়, এবার তা ছিল না। আমাদের দেশে সাধারণত মিয়ানমার বা থাইল্যান্ডের সাগর থেকে এসব ঘূর্ণি তৈরি হয়ে সাইক্লোন হয়। বঙ্গোপসাগরে তাপমাত্রা বেশি থাকলেও বিভিন্ন কারণে গত এপ্রিলে সাইক্লোন হয়নি।

 

ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা না কমাতে পারলে সমুদ্রপৃষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না

সমুদ্র উপকূলে বিশ্বের ৫৬ শতাংশ মানুষের বসবাস। যেভাবে অ্যান্টার্কটিক মহাসাগরের বরফ গলছে তাতে সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল দ্রুত তলিয়ে যাবে। বরফ গলার কারণে সমুদ্রের উচ্চতা দ্রুত সময়ে যেভাবে বাড়বে তা অভিযোজন করে কমানো সম্ভব হবে না। বরফ গলার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কী পরিমাণ বাড়ছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, নাসাসহ দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিজ্ঞানী এবং জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গবেষণা করা দরকার। এজন্য আসন্ন বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। এসব দাবি করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়াটিভের প্রধান নির্বাহী ও জলবায়ু অর্থনীতিবিদ এম জাকির হোসেন।

তিনি আরও বলেন, ভূপৃষ্ঠে যত তাপমাত্রা বাড়বে তার ফলটা গিয়ে পড়বে সমুদ্রপৃষ্ঠে। কেননা সমুদ্র ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা শুষে নিয়ে পৃথিবীকে বাস উপযোগী করে রাখে। কার্বন ডাই-অক্সাইডের এক-তৃতীয়াংশ বা এক-চতুর্থাংশ শুষে নেয় সমুদ্র। সেটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আমরা ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমাতে না পারলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না, এটি সম্ভব হবে না।

এম জাকির হোসেন বলেন, এক্ষেত্রে দুটি ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রথমত, যতটুকু তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা যাবে তা নিয়ে এক ধরনের পরিকল্পনা। দ্বিতীয়ত, যেটুকু রক্ষা যাবে না তা নিয়ে আরেকটি। তা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কী ক্ষতি হতে পারে, উত্তরণের উপায়সহ এসব বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে আলাদা একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। সেখানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের যেসব গবেষক আছেন তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে দিতে হবে। ভারত এরই মধ্যে যা করে নজির সৃষ্টি করেছে। গবেষকরা যে পরামর্শগুলো দেবেন, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

কেমন ছিল বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা

সাগরের প্রাণীদের জন্য সহনীয় তাপমাত্রা কত হবে, স্থান ও গভীরতাভেদে তার পার্থক্য হয়ে থাকে। সাগরের সাধারণ তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও মাস ও মৌসুমভেদেও তাপমাত্রার পার্থক্য থাকে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ফিজিক্যাল ও স্পেস ওশানোগ্রাফি বিভাগের সায়েন্টিফিক অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান রূপক লোধ। তিনি বলেন, যে মাছ ২২ থেকে ২৮ ডিগ্রি তাপমাত্রায় থাকে, সেখানে যদি কয়েক ডিগ্রি বেড়ে যায় সে অবশ্যই ছোটাছুটি করবে। স্থান বদলাবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে কোরালের ইকোসিস্টেমে প্রভাব পড়ে।

মদিস একোয়া ৪ কিলোমিটার রেজল্যুশনের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, গত বছরের মার্চে বঙ্গোপসাগরে দিনের তাপমাত্রা ছিল ২৭ দশমিক ৫ থেকে ২৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও রাতের তাপমাত্রা ছিল ২৬ দশমিক ৪ থেকে ২৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এপ্রিলে দিনে ছিল ২৯ দশমিক ৫ থেকে ৩০ দশমিক ৬ ও রাতে ২৮ দশমিক ৪ থেকে ৩০ দশমিক ২ ডিগ্রি। মে মাসে দিনে ছিল ২৯ দশমিক ৯ থেকে ৩১ দশমিক ৭ ও রাতে ২৮ দশমিক ৮ থেকে ৩১ দশমিক ৪ ডিগ্রি। জুনে দিনে ছিল ২৯ দশমিক ৯ থেকে ৩২ দশমিক ৭ ও রাতে ৩০ দশমিক ১ থেকে ৩২ দশমিক ৪ ডিগ্রি। আগস্টে দিনে ছিল ২৮ দশমিক ২ থেকে ৩০ দশমিক ৬ ও রাতে ২৮ দশমিক ৩১ থেকে ৩১ দশমিক ৩ ডিগ্রি।

গড় তাপমাত্রা কত ছিল, সে ব্যাপারে গ্লোবাল ওশেন অসটিয়া সি সারফেস টেম্পারাচার অ্যান্ড সি আইস অ্যানালাইসিসের তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, গত বছরের মার্চে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৭ দশমিক ১২, এপ্রিলে ২৯ দশমিক ৩৫, মে ৩০ দশমিক শূন্য ৯, জুনে ৩০ দশমিক ১৩, জুলাইয়ে ২৯ দশমিক ৯১, আগস্টে ২৯ দশমিক ৪০। চলতি বছরের মার্চে ২৭ দশমিক ১২, এপ্রিলে ২৯ দশমিক ৩৫ ও চলতি মে মাসে এখন পর্যন্ত ৩০ দশমিক ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি বলেন, দিনে সূর্যের আলোতে সমুদ্র যতটা উত্তপ্ত হয় রাতে তা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়। আবার ভূপৃষ্ঠের উত্তপ্ত তাপমাত্রাও নিজের দিকে টেনে নেয়। পরে ভূপৃষ্ঠকে শীতল করে থাকে। ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে সেজন্য সমুদ্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

 

তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বঙ্গোপসাগরে যে ক্ষতি হলো

বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়, সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েক মাস ধরে বঙ্গোপসাগরের বিভিন্ন জায়গায় জেলিফিশের আধিক্য বেড়েছে। এটাকে জেলিফিশ ব্লুম বলা হয়। জেলিফিশকে ‘ফিশ’ বলা হলেও এটি মাছ নয়, এক ধরনের অমেরুদণ্ডী প্রাণী। পৃথিবীর সব সাগর, উপসাগর এবং মহাসাগরে জেলিফিশ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী সাগর-মহাসাগরগুলোতে সাধারণত বসন্ত ও গ্রীষ্মে বেশি জেলিফিশ ব্লুমের ঘটনা ঘটে। কারণ উষ্ণ জলের তাপমাত্রা জেলিফিশকে দ্রুত যৌন পরিপক্বতায় পৌঁছয় এবং অবিশ্বাস্য গতিতে উচ্চ প্রজনন ঘটায়। বিশ্বব্যাপী মহাসাগরের তাপমাত্রার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি জেলিফিশের সংখ্যা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রা বাড়ায় গত তিন মাস জেলেরা সাগরে তেমন কোনো মাছ ধরতে পারেননি। বর্তমানেও মাছ না পেয়ে তারা ফিরে আসছেন। কেননা যখন সাগরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়, তখন মাছগুলো সেই নির্দিষ্ট স্থানে থাকে না, জায়গা পরিবর্তন করে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে লবণাক্ততা বেড়ে গিয়ে বিভিন্ন প্রাণীর জীবনাচারে বিরূপ প্রভাব পড়ে। খাদ্যচক্রে প্রভাব পড়ে। কেননা তখন ফাইটোপ্লাংকটন ব্লুম হয়। এতে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা যায়। আর যেহেতু সামুদ্রিক প্রাণীগুলো নির্দিষ্ট স্থান ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়, তাতে ইকোসিস্টেমে বিরূপ প্রভাব পড়ে। নির্দিষ্ট এলাকায় যে খাদ্যচক্র থাকে, সেটিও ভেঙে যায়।

সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়লে কোরাল ব্লিচিং হয় উল্লেখ করে এ সমুদ্রবিশেষজ্ঞ বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির এ প্রক্রিয়াটি দীর্ঘস্থায়ী হলে কোরাল ব্লিচিংয়ের কারণে প্রবাল কলোনিগুলো মারা যায়। প্রবাল প্রাচীরগুলোকে সমুদ্রের ট্রপিক্যাল রেইনফরেস্ট হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠের মাত্র ১ শতাংশেরও কম দখল করে থাকলেও ২৫ শতাংশ সামুদ্রিক প্রজাতির নার্সারি গ্রাউন্ড এবং ৩৩ শতাংশ সব পরিচিত মাছের প্রজাতির বাসস্থান। মহাসাগরের তাপমাত্রা বাড়ার ফলে সামগ্রিকভাবে সাগর-মহাসাগরের প্রাণীদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে।

সংবাদটি শেয়ার করুন।