প্রকাশনার ১৫ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৫শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
১০ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
১৯শে মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগছে না

admin
প্রকাশিত জুলাই ৭, ২০২৪, ০৬:০৮ অপরাহ্ণ
শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগছে না

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

চীন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি। দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। বাণিজ্য ঘাটটির পরিমাণও বিশাল। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন চীন সফরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পাবে বলে সরকারি নীতিনির্ধারক ও বেসরকারি সূত্রে জানা গেছে।

সোমবার (৮ জুলাই) তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিং যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে মঙ্গলবার (৯ জুলাই) বেইজিংয়ে ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

 

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন বা বিএসইসি ও বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজ যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করবে। প্রধানমন্ত্রী সম্মেলন উদ্বোধন করবেন।

এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীসহ চীনের প্রায় এক হাজার উদ্যোক্তা অংশ নেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

এ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাংলাদেশে আরও বেশি চীনের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ২০টি সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য চীনা উদ্যোক্তাদের আহ্বান জানাবেন। একই সঙ্গে এসব পণ্য যাতে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে, সে জন্য চীনের ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করবেন। এর ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি আছে, তা কিছুটা হলেও কমবে এবং এ দেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়বে।

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে চীন সরকার ২০২০ সালের জুলাই থেকে ট্যারিফ লাইনের আওতায় ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা কার্যকর করে। পরবর্তী সময়ে আরও ১ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৯৮ শতাংশ করা হয়। ফলে ট্যারিফ লাইনে পণ্যের সংখ্যা ৮ হাজারেরও বেশি।

চীন সরকারের ওই সিদ্ধান্তে তখন বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা উৎফুল্ল হন। ধারণা করা হয়েছিল, এর ফলে চীনের বাজারে বাংলাদেশি রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বাস্তবতা হচ্ছে, শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে আমদানি করে ১ হাজার ৭৮৩ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ৬৭ কোটি ডলার।

চীন যখন ৯৮ শতাংশ বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত অসুবিধা দেয়, তখন রপ্তানিকারকরা বলেছিলেন এই সুযোগ বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কিছুটা হলেও সহায়তা করবে। কিন্তু ঘাটতি কমেনি, বরং দিন দিন বেড়েই চলছে।

একক দেশ হিসেবে চীন এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের বড় ট্রেডিং পার্টনার। বাংলাদেশের মোট আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ আসে চীন থেকে। যার বেশির ভাগই তৈরি পোশাক এবং অন্যান্য শিল্প খাতের কাঁচামাল। চীনের প্রধান ২০টি আমদানি পণ্যের তালিকায় বাংলাদেশি কোনো রপ্তানি পণ্য নেই।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির পেছনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এর জন্য প্রধানত দুটি কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, চীনের বাজারে বিক্রি করার মতো বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্যও নেই। দ্বিতীয়ত, মার্কেটিং বা বিপণনব্যবস্থার দুর্বলতা। চীন যেসব পণ্য আমদানি করে, সেগুলো বাংলাদেশ তৈরি করতে পারে না।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্য চীনের বাজারে বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এ দেশে চীনের বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে এবং এই বিনিয়োগ হতে হবে রপ্তানিমুখী শিল্পে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশি পোশাকের প্রধান বাজার হচ্ছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র। এসব বাজারে পণ্য রপ্তানিকে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা যেভাবে গুরুত্ব দেন, চীনের ক্ষেত্রে একইভাবে সেই গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমানে চীনে তার রপ্তানির সক্ষমতার মাত্র ৩০ শতাংশ কাজে লাগাতে পেরেছে। সক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারলে চীনের বাজারে রপ্তানি অন্তত ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন বাড়ানো সম্ভব।

গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্ট্রিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘চীনে ব্যবসা করতে হলে সে দেশের খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকতে হবে। যেটা বাংলাদেশ করতে পারছে না। অর্থাৎ চীনে মার্কেটিং করার সামর্থ্য আমাদের তৈরি হয়নি। তা ছাড়া চীনের বাজারে বিক্রি করার মতো পণ্য আমাদের নেই। কারণ রপ্তানিযোগ্য পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে পোশাক। আর চীন পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের মধ্যে শীর্ষে। চীন বছরে মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক পণ্য আমদানি করে। তারা উন্নত ও উচ্চমূল্যের পোশাক ব্যবহার করে। আমরা শুধু বেসিক বা মৌলিক পণ্য তৈরি করি।’

তিনি আরও বলেন, ‘চীনের বিনিয়োগ প্রচুর এলে সে দেশে বেশি পণ্য রপ্তানি করা যাবে। এই বিনিয়োগ লাগবে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্পে। চীন এ দেশে পণ্য তৈরি করে ওই পণ্য নিজে দেশে রপ্তানি করতে পারবে। এতে বাংলাদেশ ও চীন উভয়ই লাভবান হবে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘চীনের সঙ্গে আমাদের ঘাটতি বিশাল, এটি সত্য। কিন্তু এই ঘাটতি নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। ঘাটতির বড় একটি কারণ হচ্ছে বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে তার বেশির ভাগ কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি করা হয়। ওই কাঁচামাল ব্যবহার করে বাংলাদেশ পণ্য তৈরি করে বিদেশি রপ্তানি করে। বাংলাদেশের জন্য সুবিধা এই যে, চীন থেকে আমদানি করা কাঁচামাল সস্তা। ফলে চীনের সঙ্গে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে আমাদের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে, আমাদের রপ্তানিযোগ্য পণ্যের তালিকা খুবই কম।’ আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করে লাভ নেই, যদি চীনের পর্যাপ্ত বিনিয়োগ বাংলাদেশে না আসে।’ প্রধানমন্ত্রীর সফর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চীন বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোর একটি। সে দেশের উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব।’

সূত্র জানায়, চীনে বর্তমানে যেসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে সেগুলো হচ্ছে ইলেকট্রনিক সার্কিট, অপরিশোধিত তেল, মোটরকার, ফোন সিস্টেম ডিভাইস, পেট্রোলিয়াম গ্যাস, সয়াবিন তেল, তামার তার, ডেটা প্রসেসিং মেশিন, সেমিকন্ডাক্টর, পরিশোধিত তামা, পলিমার, স্কিন কেয়ার প্রোডাক্ট, লো-ভোল্টেজ সুইচ ইত্যাদি। বাংলাদেশের এসব পণ্য তৈরির সক্ষমতা নেই। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে চীনে কিছু পোশাক পণ্য রপ্তানি হয়। এর বাইরে রয়েছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং প্লাষ্টিক।

তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘চীন পোশাকশিল্প থেকে আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। এর দুটি কারণ। প্রথমত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ। দ্বিতীয়ত, চীনে হাইটেক শিল্পের প্রসার ঘটেছে। শ্রমিকরা পোশাকের বদলে হাইটেক শিল্পে কাজ করতে আগ্রহী। কারণ সেখানে বেতন পোশাকশিল্পের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে ভবিষ্যতে চীনে বাংলাদেশি পোশাকপণ্যের রপ্তানির সুযোগ আছে।’ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘শুধু পোশাকপণ্য রপ্তানি করে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমবে না। আমাদের রপ্তনি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে।’

বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন মৃধা বলেন, ‘চীন যেসব পণ্য আমদানি করে সেগুলো আমরা তৈরি করতে পারছি না। যে পণ্যটি চীনে তৈরি হচ্ছে, সেটি যেন বাংলাদেশে তৈরি হয়- এমন উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশে আরও বেশি বেশি চীনের বিনিয়োগ লাগবে। চীনে যেসব পণ্যের চাহিদা আছে, সেগুলো আমাদের তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের সামুদ্রিক মাছ, আম, কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। আরও নতুন কিছু পণ্য নিতে চাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে এ ক্ষেত্রে আমরা সুখবর পেতে পারি।’

সংবাদটি শেয়ার করুন।