প্রকাশনার ১৫ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৫শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
১০ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
১৯শে মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

প্রাথমিক বিদ্যালয় কমছে শিক্ষার্থীও কমছে

admin
প্রকাশিত জুলাই ৩, ২০২৪, ০৪:৪৩ অপরাহ্ণ
প্রাথমিক বিদ্যালয় কমছে শিক্ষার্থীও কমছে

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

২০১৮ সালে দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৪ হজার ১৪৭টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৮৪ জন। তবে ৫ বছর পর ২০২৩ সালে এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৬৩০টি। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমেছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীও।

২০২৩ সালে প্রাথমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৬৮৫ জন। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে দেশে ১৯ হাজার ৫১৭টি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ১২ লাখ ২ হাজার ৭৯৯ জন শিক্ষার্থী কমেছে। খোদ সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) প্রস্তুত করা বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি বা অ্যানুয়াল প্রাইমারি স্কুল সেনসাস (এপিএসসি) ২০২৩-এ উঠে এসেছে এ চালচিত্র।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে জন্মহার কমেছে; অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের স্কুলে না পড়িয়ে কওমি মাদ্রাসায় পড়াচ্ছেন। এসব কারণে প্রাথমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে। আবার সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহের কারণে আগের মতো আর শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানো সম্ভব হচ্ছে না। এটিও সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, ইবতেদায়ি মাদ্রাসাসহ এই পর্যায়ের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যের আলোকে এপিএসসি তৈরি করা হয়। তবে কওমি মাদ্রাসাগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে না থাকায় ডিপিই এসব প্রতিষ্ঠান ও তাদের শিক্ষার্থীর হ্রাস-বৃদ্ধির পরিসংখ্যান এবং অন্যান্য তথ্য শুমারিতে যুক্ত করতে পারছে না।

সম্প্রতি প্রকাশিত এপিএসসি-২০২৩-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের পর থেকে ক্রমেই কমছে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ২০১৯ সালে দেশের ১ লাখ ২৯ হাজার ২৫৮টি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ২ কোটি ১ লাখ ২২ হাজার ৩৩৭ জন, ২০২০ সালে ১ লাখ ৩৩ লাখ ২টিতে ছিল ২ কোটি ১৫ লাখ ৫১ হাজার ৬৯১ জন, ২০২১ সালে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৯১টিতে ছিল ২ কোটি ৯০ হাজার ৫৭ জন, ২০২২ সালে ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৩৯টিতে ছিল ২ কোটি ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৯১ জন শিক্ষার্থী।

পরিসংখ্যানে আরও দেখা যাচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ৮ লাখ ৩২ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী কমেছে। এর মধ্যে কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই কমেছে ১০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। বিপরীতে কিন্ডারগার্টেনে প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার ও ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় ৩৬ হাজার শিক্ষার্থী বেড়েছে। তবে করোনা মহামারির কারণে ২০২১ ও ২০২২ সালে প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কিছুটা কমে গেলেও ২০২৩ সালে আবার বেড়েছে।

 

 

শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত হয়নি, ঝরে পড়া কমছে না

 

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনও নিশ্চিত হয়নি শতভাগ ভর্তির হার। আবার প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা শেষ করার আগেই ঝরে পড়ছে অনেক শিক্ষার্থী।

এপিএসসির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শিক্ষার্থী ভর্তির হার ২০১৮ সালে ছিল ৯৭ দশমিক ৮৫, ২০১৯ সালে ৯৭ দশমিক ৭৪, ২০২০ সালে ৯৭ দশমিক ৮১, ২০২১ সালে ৯৭ দশমিক ৪২, ২০২২ সালে ৯৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৯৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পাঁচ বছর পরে এসে শিক্ষার্থী ভর্তির হার বেড়ে যাওয়ার বদলে উল্টো কমতে শুরু করেছে। তা ছাড়া শিক্ষার্থী ভর্তির হার বলতে গেলে একই পর্যায়ে ঘুরপাক খাচ্ছে।

আর পঞ্চম শ্রেণি পাস করার আগেই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার, ২০১৮ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০১৯ সালে ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২০ সালে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ, ২০২১ সালে ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশ, ২০২২ সালে ১৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ। তুলনা করে দেখা যায়, ২০১৮ সালের তুলনায় পাঁচ বছর পরে এসে ঝরে পড়ার হার কিছু কমলেও ঝরে পড়া পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হয়নি।

 

 

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

 

একাধিক কর্মকর্তা জানান, করোনার পর থেকে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কমছে শিক্ষার্থী; বিপরীতে বাড়ছে কওমি মাদ্রাসাগুলোতে। শিক্ষার্থী সংকটের কারণে সরকারকে ইতোমধ্যে বেশ কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে পাসের অন্য কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৭। ইতোমধ্যে মাত্র ১০-৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে, এমন প্রায় ১৫০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চিহ্নিত করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। চাহিদা এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করে যেকোনো সময় এগুলোও একীভূত করা হতে পারে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে মাদ্রাসায় উল্লেখযোগ্যহারে শিক্ষার্থী বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করে চলতি বছর জেলা প্রশাসক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন ৪ মার্চে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্য অধিবেশনে উদ্বেগ প্রকাশ করেন একাধিক জেলা প্রশাসকও। শিক্ষাসম্পৃক্ত বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারাও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। ডিসি সম্মেলনে ওই অধিবেশন শেষে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘দেশব্যাপী যেখানে সেখানে কওমি-নূরানী মাদ্রাসা বাড়ছে। এতে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এটি সবার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এর সমাধা করতে হবে।’

মাদ্রাসা নিবন্ধনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধিত হওয়ার প্রক্রিয়ার বাইরে যারা মাদ্রাসা খুলছেন, সেগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত নয়। সেক্ষেত্রে কীভাবে বেফাক তাদের ছয়টি বোর্ডের মাধ্যমে নিবন্ধন দিচ্ছে, তা নিয়ে তাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। একটি বয়সসীমা পর্যন্ত সেখানে যাতে জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুসরণ করা হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। না-হলে শিক্ষার্থীরা কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করতে পারবে না।’

জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে আসার কারণেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যাও কমছেÑ এমন পর্যবেক্ষণ রয়েছে চলতি বছরের এপিএসসিতে। অবশ্য ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ, যা ২০২২ সালে কমে ১ দশমিক ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। এ ছাড়া বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘ইনটেগ্রেটেড প্রাইমারি এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন’ নামের সফটওয়্যারের মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কেউ কেউ দাবি করেছেন, এই সফটওয়্যার ব্যবহারে একই শিক্ষার্থীর নাম একাধিকবার থাকার সুযোগ নেই। এভাবে শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা হিসাবের আওতায় আসছে বলে মনে করছেন কোনো কোনো কর্মকর্তা।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘শিক্ষার্থী কমার মূল কারণ কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। এর ফলে সাধারণ ধারার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কমছে। আমরা দেখেছি মহামারি করোনা ও তার পরবর্তী সময়ে নানা সংকটের কারণে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের মাদ্রাসায় দিয়েছেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সুযোগ-সুবিধা ও মানসম্পন্ন পড়াশোনা নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কমবে। এ ছাড়া জন্মহার কমার কারণে শিক্ষার্থী কমছে বলেও জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব ফরিদ আহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছেÑ এ কথা সত্য। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছেÑ এটাও সত্য। যেমনÑ গত বছরের তুলনায় ৮৬২টি কিন্ডারগার্টেন স্কুল বাড়লেও তাদের শিক্ষার্থী কমেনি। সব মিলিয়ে এই শিক্ষার্থী কমার অন্যতম একটি কারণ হলো জন্মনিয়ন্ত্রণ। এ ছাড়াও করোনা মহামারির ধাক্কা, উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছিল। এখন এই সুবিধাগুলো চালু হয়েছে। আশা করছি এবার শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়বে।’

সংবাদটি শেয়ার করুন।