প্রকাশনার ১৫ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৯শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
১১ই জিলকদ, ১৪৪৫ হিজরি

গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকাতে নামছে তদারকি সেল

admin
প্রকাশিত
গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকাতে নামছে তদারকি সেল

গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য রোধ ও যাত্রীসেবা নিশ্চিতে মাঠে নামছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের বিশেষ তদারকি সেল। অধিদফতরের ঢাকাসহ দেশের সব বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধানদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, গণপরিবহনের ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রীসেবা নিশ্চিতে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। এর আগেও অধিদফতরের পক্ষ থেকে এমন কার্যক্রম চালু ছিল। ওই সময় প্রথম অবস্থায় রাজধানী ও পরে সারা দেশে তদারকি করা হয়। তবে এবার নতুন করে সেল গঠন করা হয়েছে। সেলের সদস্যরা কঠোরভাবে তদারকি করবেন। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এ সেল মাঠে নামবে। সপ্তাহের ৬ দিন রাজধানীসহ প্রত্যেকটি জেলার বাসস্ট্যান্ডে ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করবে।

তিনি আরও বলেন, সদস্যরা অধিদফতরের পরিচয় না দিয়ে যাত্রী হিসেবে গণপরিবহনে ভ্রমণ করবেন। এ সময় ভাড়া ও যাত্রীসেবা নিয়ে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা কোনো ধরনের নৈরাজ্য করলেই মালিক থেকে শুরু করে চালক ও পরিবহনের হেলপারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ভোক্তা আইনে মামলা করে শাস্তির আওতায় আনা হবে। আর শাস্তির ক্ষেত্রে প্রাথমিক অনিয়মে জরিমানা ও বড় ধরনের অনিয়মে জেলে পাঠানো হবে।

তিনি বলেন, অধিদফতর সব সময় ভোক্তার অধিকার রক্ষায় কাজ করছে। বর্তমানে পরিবহন সেক্টর ত্রাসে পরিণত হয়েছে। যার কাছে যেভাবে পারছে ভাড়া আদায় করছে। কিন্তু দেয়া হচ্ছে না নির্ধারিত যাত্রীসেবা। সরকারের দেয়া ভাড়ার মূল্যতালিকাও মানা হচ্ছে না।

অনেক সময় তারা যাত্রীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করে। সব মিলিয়ে একজন ভোক্তা পরিবহন খাতে সেবা নিতে গিয়ে অনেকভাবে প্রতারিত হচ্ছেন। আমরা এই প্রতারণা রোধ করতে চাই। এজন্য ঢাকাসহ দেশের প্রত্যেক বিভাগীয় প্রধানকে নিয়ে গঠিত কমিটির নেতৃত্বে বিশেষ তদারকি করা হবে।

এদিকে যাত্রীদের অভিযোগ রাজধানী ও আশপাশের রুটে চলাচলকারী বাসে সিটিং সার্ভিসের নামে লাগামহীনভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এসব বাস লোকাল স্টাইলে চললেও আদায় করা হচ্ছে সিটিংয়ের নামে গলাকাটা ভাড়া। এছাড়া একই রুটে বিভিন্ন পরিবহন ভিন্ন ভিন্ন ভাড়া আদায় করছে।

সরকার নির্ধারিত বড় বাসে সাত টাকা ও মিনিবাসে পাঁচ টাকার সর্বনিু ভাড়া কোনো গণপরিবহনই নেয় না। তারা সর্বনিু ভাড়া ১০ টাকা আদায় করছে। এ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রাজধানীর এয়ারপোর্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পরিবহন লি. ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ভাড়া আদায় করছে ১০ টাকা। কিন্তু বিআরটিএ’র হিসাব অনুযায়ী, ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার দূরত্বের হিসাবে বাসের ভাড়া চার টাকা ও মিনিবাসের ভাড়া চার টাকারও কম হওয়ার কথা। সর্বনিু ভাড়া হিসেবে এ দূরত্বে বাসে সাত টাকা ও মিনিবাসে পাঁচ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু এ পরিবহন সংশ্লিষ্টরা ১০ টাকা ভাড়া নিচ্ছেন। এছাড়া মহাখালী থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৮ টাকা। এই রুটে বিভিন্ন পরিবহন ভাড়া আদায় করছে ২০ টাকা।

রাজধানীর নর্দ্দা বাসস্ট্যান্ড থেকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের দূরত্ব ৫ কিলোমিটার না হলেও এর জন্য বাস যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে ২৫ টাকা।

অপরদিকে আজমেরী গ্লোরি, স্কাইলাইন, প্রভাতী-বনশ্রী, বলাকা বাসে বনানী থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ২০ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অথচ নাবিস্কো, সাতরাস্তা বা মহাখালী থেকে উঠলেও নেয়া হচ্ছে একই ভাড়া। বিআরটিএ’র হিসাব অনুযায়ী, গুলিস্তান থেকে বনানী পর্যন্ত ভাড়া সর্বোচ্চ ১৯ টাকা ও নাবিস্কো থেকে ১৪ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বাসগুলো এ নিয়ম মানছে না।

এয়ারপোর্ট-বঙ্গবন্ধু এভিনিউ পরিবহনের একটি বাসের চালক মো. আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বিআরটিএ’র নির্ধারিত ভাড়া নিতে গেলে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। কারণ বিভিন্ন স্থানে আমাদের টাকা দিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। মালিকরা সিটিং সার্ভিস চালুর মাধ্যমে অল্প কিছু টাকা বাড়িয়ে ভাড়া নির্ধারণ করেছে। যাতে যাত্রীদেরও কোনো সমস্যা না হয়। আর আমরাও মালিকদের টাকা জমা দিয়ে নিজেদের পকেটে কিছু টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারি। তবে মালিকরা বিআরটিএ’র সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছে কিনা তা জানি না।

আকাশ সিটিং সার্ভিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চালক বলেন, কেরানীগঞ্জ থেকে গাড়ি নিয়ে গুলিস্তান আসতেই পরিবহন সমিতিকে টাকা দিতে হয়। আবার নর্দ্দার আগে আরেক পার্টি টাকা তোলে।

সব মিলিয়ে আমরা যদি সরকারের দেয়া চার্টে ভাড়া আদায় করি, তাহলে লাভ তো দূরের কথা, চালানই উঠবে না। তাই মালিকপক্ষ ওয়েবিলের মাধ্যমে সিটিং সার্ভিস চালু করেছে। যার কারণে ভাড়া একটু বেশি। তবে ভাড়া অনুযায়ী আমরা যাত্রীকে উপযুক্ত সেবাও দেই।

ভোক্তা অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, পরিবহনে যাত্রীর সেবা নিশ্চিত ও অসাধুদের শাস্তি দিতে একটি রোডম্যাপ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- চালকরা অসুস্থ প্রতিযোগিতা করলে, পরিবহনে অতিরিক্ত বা দাঁড়িয়ে যাত্রী নিলে, নির্ধারিত স্থান ছাড়া যাত্রী ওঠানো বা নামানোর মাধ্যমে যাত্রী হয়রানি করলে, নারী যাত্রীদের আসন সেবা সুষ্ঠুভাবে নিশ্চিত না করলে, সিটিং সার্ভিসের নামে বেশি ভাড়া নিয়ে উপযুক্ত যাত্রীসেবা না দিলে, সিটিং সার্ভিসে একজন যাত্রী নির্ধারিত স্থানে নেমে গেলে তার সিট নতুন করে অন্য যাত্রীর কাছে বিক্রি করলে ভোক্তা আইনে শাস্তি দেয়া হবে। তাছাড়া শুধু স্পটেই নয়, যাত্রীরা কোনো ধরনের অনিয়ম পেলে প্রমাণসহ অধিদফতরে এসে মামলা করতে পারবে। পরে শুনানির মাধ্যমে অভিযোগের প্রমাণ মিললে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান ড. গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের এ পরিকল্পনা অনেক প্রশংসনীয়। আর এই তদারকি যদি জোরদার ও সুষ্ঠুভাবে করা যায়, তাহলে জনসাধারণের জীবনে স্বস্তি আসবে।

কারণ টাকা খরচ করে ভোক্তার নির্ধারিত সেবা পাওয়া তার অধিকার। আর সেটা থেকে তাকে অনৈতিকভাবে বঞ্চিত করলে তার অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। তাই এ বিষয়ে অধিদফতরের তদারকি করা উচিত। তবে তদারকি যাতে বন্ধ হয়ে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ যাত্রীরা প্রতিকার পাবে না।

বিআরটিএ’র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আইনে সিটিং সার্ভিস বা ওয়েবিল নামে ভাড়া আদায়ের কোনো বিধান নেই। এসব কথা বলে বাড়তি ভাড়া আদায়েরও কোনো সুযোগ নেই।

বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া সাত টাকা ও প্রতি কিলোমিটার ১.৭০ টাকা এবং মিনিবাসে সর্বনিম্ন পাঁচ টাকা ও কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১.৬০ টাকা। এর বেশি ভাড়া নেয়ার সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায়ের অভিযোগ আমরাও পাই। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের সময় এমন অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

এদিকে বিআরটিএ সূত্র বলছে, ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চলাচলকারী বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়। সে সময় বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৭০ পয়সা ও মিনিবাসের ভাড়া ১ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। বাসের ৭ টাকা ও মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ নির্ধারণ করা হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন।