প্রকাশনার ১৫ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৫শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
১০ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
১৯শে মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

খুনিরা কেন এত নৃশংস

admin
প্রকাশিত জুন ১৩, ২০২৪, ০৬:৪৭ অপরাহ্ণ
খুনিরা কেন এত নৃশংস

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

খুনের পর টুকরো টুকরো করে হাড়-মাংস আলাদা করা, বস্তায় ভরে মাথা এক জায়গায় ফেলে দেওয়া তো দেহ আরেক জায়গায়, একটি গুলিতেই যেখানে মৃত্যু নিশ্চিত করা যায় সেখানে পরপর ৩৮ রাউন্ড গুলি- খুন কত নৃশংস হতে পারে, সেটাই এখন প্রত্যক্ষ করছে দেশের মানুষ। আগে খুনের পর লাশের ওপর এমন নৃশংসতা কমই লক্ষ করা গেছে। এখন কত নৃশংসভাবে খুন করা যায়- সেটাই যেন ধরন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি দুটি নয়, একের পর এক ঘটনা। খুনিরা কেন এত নৃশংস হয়ে উঠেছে, মিলছে না তার উত্তর।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যেমন অপরাধপ্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তেমনি অপরাধের ক্ষেত্রে বেড়েছে নৃশংসতাও। পারিবারিক সহিংসতাও ঘটছে প্রায় নিয়মিত। কথায় কথায় আপনজনই হয়ে উঠছে হন্তারক। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন অথবা আত্মীয়-পরিজনের কাছ থেকেও নিষ্ঠুরতার শিকার হওয়ার এমন সব ঘটনা ঘটছে যে, এখন কাছের মানুষজনকেও বিশ্বাস করাটা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণ ছোট-বড় অপরাধ তো মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়েছেই, পাশাপাশি খুনের পর লাশ গুম করতে খণ্ড-বিখণ্ড করার মতো ভয়ানক প্রবণতাও বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতির জন্য সামাজিক অবক্ষয়, আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়কে অনেকাংশে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা। খুনিদের এত নৃশংস হওয়ার কারণ অনুসন্ধানে ঘটনার একেবারে গভীরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, অপরাধ সমূলে উৎপাটন করতে হলে এর বাইরে টোটকা কোনো দাওয়াই নেই।

গত কয়েক মাসের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে অধিকাংশই ঘটানো হচ্ছে পরিকল্পিত উপায়ে। যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষেও প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। যদিও যেকোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার কঠোর নির্দেশনা রয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে। সকল জেলার এসপি, রেঞ্জ ডিআইজি ও মেট্রোপলিটন কমিশনারদের এই নির্দেশনা দিয়ে হত্যা মামলা সরাসরি এসপিদের তদারকি করতে বলা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির বিষয়টি অবশ্য মানতে নারাজ পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সামাজিক অপরাধ আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। দাঙ্গা বা রায়টিং অপরাধ হলে পুলিশের পক্ষে সেটা প্রতিরোধ করা সহজ।

সাম্প্রতিক ঘটনাবলি থেকে দেখা যায়, গত ২ জুন বগুড়ার শাজাহানপুরে আবাসিক হোটেল থেকে আশামনি নামে এক নারী ও তার ছেলে রাফির গলাকাটা লাশ উদ্ধার করা হয়। নৃশংস এ ঘটনায় আশামনির স্বামী আজিজুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আজিজুল তার স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যার পর লাশ বস্তাবন্দি করে হোটেল কক্ষের টয়লেটে রাখে। আর সন্তানের গলা কেটে মাথা আলাদা করে বস্তায় ভরে পাশের করতোয়া নদীতে ফেলে দেয়। পুলিশ জানিয়েছে দাম্পত্য কলহের কারণে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে আজিজুল।

একই দিন রাজধানীর ভাটারা থানার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আরিফুল ইসলাম নামে এক জাপানপ্রবাসীর গলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, হত্যাকাণ্ডের এক দিন আগে আরিফুলের কথিত স্ত্রী পারভীন কানাডা থেকে বাংলাদেশে আসেন। ঘটনার দিন বিকালে ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন এবং হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পরদিন কানাডায় পালিয়ে যান। কানাডা থেকে তিনি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে বক্তব্যও দিয়েছেন। তাকে ফেরাতে দ্রুতই আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

গত ২ জুন পাবনার ঈশ্বরদী ইপিজেডের প্রবেশপথে শত শত মানুষের সামনে রিনা নামে এক নারী শ্রমিকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। রিনা ইপিজেডের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। দাম্পত্য কলহের জেরে স্বামী মিলন তাকে হত্যা করে। মিলনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপু‌রে নওশিন ইসলাম শ‌র্মিলা (১০) নামে এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থী নিখোঁজের ৯ দিন পর গত ৩ জুন উপ‌জেলার গো‌বিন্দাসী ইউনিয়‌নের চিতু‌লিয়াপূর্বপাড়া এলাকার এক‌টি ধান‌ক্ষেত থেকে তার বস্তাব‌ন্দি দ্বিখ‌ণ্ডিত লাশ উদ্ধার ক‌রে‌ পু‌লিশ। নওশিন স্থানীয় হাফি‌জিয়া মাদ্রাসা ও নুরানী কিন্ডারগা‌র্টেনের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সে চিতু‌লিয়াপূর্বপাড়া এলাকার সুমন মিয়ার মেয়ে। ২৬ মে নি‌খোঁজ হওয়ার পর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল।

একই দিন গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে পাপিয়া বেগম (৪৫) নামে এক গৃহবধূকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। জমিসংক্রান্ত বিরোধের কারণে ওই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।

এ ছাড়াও ৩ জুন ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল মহাসড়কে সেতুর নিচ থেকে এক শিক্ষার্থীর মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত শিক্ষার্থীর নাম ওমর ফারুক সৌরভ। তিনি ঢাকার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষে পড়তেন। সৌরভ এক মাস আগে প্রেম করে তার চাচাতো বোন ইভাকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে তার পরিবারের বিরোধ চলছিল। পুলিশ ইভার বাবা ও ভাইসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ওমর ফারুককে হত্যার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে কয়েক খণ্ড করার কথা স্বীকার করেছে তারা। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডগুলো মাত্র কয়েক দিনের। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নৃশংস অপরাধ ঘটে চলেছে।

সম্প্রতি সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হচ্ছে, ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারের হত্যাকাণ্ড। ঘটনাটি ভারতের মাটিতে ঘটলেও এর প্রেক্ষাপট বাংলাদেশে। এর সঙ্গে জড়িত মূল অপরাধীরা এদেশেরই। গত মে মাসের শেষ দিকে এমপি আনারকে পশ্চিমবঙ্গের একটি ভাড়া বাড়িতে হত্যার পর তার লাশ টুকরো টুকরো করা হয়। হাড়-মাংস আলাদা করা এবং সেগুলো ছোট ছোট টুকরো করে খালে ফেলে দেওয়া এবং কমোডে ফ্লাশ করে গুম করার মতো ভয়ানক ঘটনা জেনেছে দুই দেশের মানুষ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেক কর্মকর্তাও বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা দেশের অপরাধের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

সর্বশেষ গত ৭ জুন দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় রাজিয়া খাতুন (৭৫) নামে এক বৃদ্ধাকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। নিহত রাজিয়া খাতুন ওই গ্রামের ছবেদুল ইসলামের স্ত্রী। শুক্রবার দুপুরে পশ্চিম ধনগাঁও এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাতের কোনো একসময় দুর্বৃত্তরা ঘরে ঢুকে রাজিয়া খাতুনকে গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়। সকালে পরিবারের লোকজন মরদেহ দেখে পুলিশকে খবর দেয়।

এ ছাড়া এদিন নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার মদনপুরের মুরাদপুর গ্রামে মনিরুজ্জামান মনু নামে এক যুবককে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রথমে গুলি, পরে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। স্থানীয় সন্ত্রাসী মিঠু, টিটু ও মনিরের নেতৃত্বে ১০-১২ সন্ত্রাসী ওই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

 

পুলিশের পরিসংখ্যান

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে গত এপ্রিলের আগ পর্যন্ত ১৬ মাসে দেশে প্রায় সাড়ে চার হাজার হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আর্থিক বা সম্পত্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও নারীঘটিত কারণে বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে এবং ২০২৩ সালের তুলনায় চলতি বছর মে মাস পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। গত জানুয়ারির চেয়ে এপ্রিলে ৬৫টি হত্যাকাণ্ড বেশি হয়েছে।

 

পুলিশ যেভাবে দেখছে

নৃশংস অপরাধ ও খুন বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ‍পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (অতিরিক্ত আইজিপির পদোন্নতিপ্রাপ্ত) আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ব্যক্তিগত বিরোধকেন্দ্রিক পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি ‍পুলিশের পক্ষে আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব।’ উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘বগুড়ায় হোটেল কক্ষে স্বামীর হাতে স্ত্রী-সন্তান খুন হয়েছে। সেখানে পুলিশের পক্ষে আগাম তথ্য নিয়ে খুন প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। একইভাবে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে দুজন নারী-পুরুষ এক কক্ষে ছিলেন। তাদের মধ্যে বিরোধের এক পর্যায়ে একজন আরেকজনকে খুন করেছেন। এ ধরনের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ব্যক্তিগত বিরোধজনিত হত্যাকাণ্ডের পর আমরা দ্রুত আসামি গ্রেপ্তার, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করে থাকি। প্রায় প্রতিটি ঘটনারই রহস্য উন্মোচন করা হয়েছে।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, জমিজমা বা সম্পত্তি সম্পর্কিত বিরোধের কারণে যেখানে দাঙ্গা বা রায়ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, সেখানে পুলিশ গিয়ে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। খুনের ঘটনা প্রতিরোধ করা যায়। যেকোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলে পুলিশের কাজ দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। পুলিশ দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করছে।

 

অপরাধ বিশ্লেষকদের বক্তব্য

নৃশংস অপরাধ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে, বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, এসব অপরাধ বৃদ্ধির কারণ ক্ষমতার দম্ভ এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা। এ দুটি বিষয় নৃশংস অপরাধের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। কারণ অপরাধীরা মনে করে তাদের কিছুই হবে না, তারা পার পেয়ে যাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা অপরাধ বাড়ায়। অপরাধীর সাহস বেড়ে যায়; তারা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর দুঃসাহস পায়। শাস্তির ভয় না থাকলে অপরাধ দমন কঠিন। যেকোনো দেশে অপরাধের সঠিক বিচার ও আইনের প্রয়োগ থাকলে সামাজিক অপরাধ অনেক কম হয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে ছোটখাটো সামাজিক অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা একসময় বড় ও নৃশংস অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার কারণেও হত্যাকাণ্ডসহ নানা ধরনের অপরাধ বেড়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন।